চূড়ান্ত রায় শুনলেন কামারুজ্জামান

চূড়ান্ত রায় শুনলেন কামারুজ্জামান

[ যে অপরাধ মানুষের কাছে করা হয় সেই অপরাধের জন্য মানুষের নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করা কোন গুনাহের কাজ নয়। সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি হলেন দেশের মানুষের অভিভাবক। তাকে আমাদের সংবিধানে কোন নাগরিকের অপরাধ ক্ষমা ও শাস্তি মওকুফের ক্ষমতা দেয়া হয়েছে। ‘ক্ষমা চাওয়া আর প্রান ভিক্ষা চাওয়া এক কথা নয়’ । তাঁর তার নিকট ক্ষমা চাইলে তা কোন ভাবে শরিয়ত বিরোধী হবে না । কাল হাশরের দিনে আল্লাহ কেবল তার হুকুম অমান্যের জন্য যে গুনা করা হয়েছে তা মাফ করবেন, কিন্তু যে গুনা করা হয়েছে মানুষের হক বা অধিকার নষ্ট করে – তা তিনি ক্ষমা না করে বলবেন, যাও তার কাছ থেকে ক্ষমা নিয়ে আস। এছাড়া পবিত্র কোরানের তাফসিরে আছে । দাঊদ আ. কে ওরিয়ার কাছে ক্ষমা চাইতে বলা হয়েছিলো। তিনি তা করে ও ছিলেন। তা হলে জনাব কামরুজ্জামান যদি নিজের দোষ স্বীকার করে ক্ষমা চান তবে তা বে-শরীয়তী হবে না । অনাবিল মুক্ত মন নিয়ে, ইগো ত্যাগ করে, বৃহত্তর স্বার্থে ক্ষমা প্রার্থনা অন্যায় হবে না । ভেবে দেখবেন]

মানবতাবিরোধী অপরাধে ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মুহাম্মদ কামারুজ্জামানের রিভিউ আবেদন খারিজ আদেশের কপি কারাগারে পৌঁছেছে। কারা কর্তৃপক্ষ রায় পড়ে তাঁকে শুনিয়েছে। এখন প্রাণভিক্ষার আবেদন করবেন কি না, সে ব্যাপারে আইনজীবীর সঙ্গে পরামর্শ করতে চেয়েছেন কামারুজ্জামান। আজ সকালে আইনজীবীরা তাঁর সঙ্গে কারাগারে দেখা করবেন।

কামারুজ্জামানের রিভিউ আবেদন খারিজের রায়ের আদেশে প্রধান বিচারপতিসহ চার বিচারপতি গতকাল দুপুরে সই করেন। এরপর আদেশের স্বাক্ষরিত কপি প্রথমে সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রার কার্যালয়, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও ঢাকা জেলা ম্যাজিস্ট্রেট কার্যালয়ে পাঠানো হয়। সেখান থেকে কপিটি বিকেল পৌনে পাঁচটার দিকে পাঠানো হয় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে। এরপর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল থেকে সেই কপি কারাগারে পৌঁছায় বিকেল পাঁচটা ৪৫ মিনিটে।

কারা সূত্র জানিয়েছে, আদেশের কপি হাতে পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে কারাগারের তত্ত্বাবধায়ক ফরমান আলী সেটা নিয়ে কামারুজ্জামানের সেলে যান। এ সময় তিনি বসে বসে তসবি জপছিলেন। তত্ত্বাবধায়ক পুরো আদেশটি তাঁকে পড়ে শোনান। এরপর তাঁর কাছে জানতে চান, তিনি প্রাণভিক্ষার জন্য রাষ্ট্রপতির কাছে আবেদন করবেন কি না। কামারুজ্জামান তত্ত্বাবধায়কের কথা শুনে কিছুক্ষণ নীরব থাকেন। এরপর বলেন, আমি আইনজীবীর সঙ্গে কথা বলি, তারপর জানাব।

কামারুজ্জামানের আইনজীবী শিশির মনির গতকাল প্রথম আলোকে বলেন, আজ বেলা ১১টায় তাঁরা কামারুজ্জামানের সঙ্গে দেখা করবেন। কারা প্রশাসন থেকে বিষয়টি তাঁদের জানানো হয়েছে। কামারুজ্জামানের সঙ্গে কথা বলার পর তাঁরা আবেদন করবেন কি না, তা জানাবেন।

কারাগারের একজন কর্মকর্তা বলেন, মানবতাবিরোধী অপরাধে দণ্ডিত আরেক জামায়াত নেতা কাদের মোল্লার কাছেও প্রাণভিক্ষার ব্যাপারে জানতে চাওয়া হয়েছিল। তিনি সঙ্গে সঙ্গে জানিয়ে দিয়েছিলেন যে কোনো আবেদন করবেন না।

অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম জানান, এখন মৃত্যুদণ্ড থেকে রেহাই পেতে হলে কামারুজ্জামানকে একমাত্র রাষ্ট্রপতির কাছে প্রাণভিক্ষার আবেদন করতে হবে। রাষ্ট্রপতি যদি তাঁকে ক্ষমা করেন, তবেই তিনি মৃত্যুদণ্ড থেকে রেহাই পাবেন।

কারা প্রশাসনের কর্মকর্তারা জানান, কামারুজ্জামান যদি প্রাণভিক্ষার জন্য আবেদন করতে চান, তবে সেই প্রক্রিয়া শেষ না হওয়া পর্যন্ত ফাঁসির রায় কার্যকর করার বিধান নেই। আর যদি প্রাণভিক্ষা চাইতে রাজি না হন, তাহলে বিষয়টি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে জানানো হবে। এরপর কখন ফাঁসি কার্যকর করা হবে, তা মন্ত্রণালয় ঠিক করে দেবে।

কারা অধিদপ্তরের ঢাকা বিভাগের উপমহাপরিদর্শক গোলাম হায়দার প্রথম আলোকে বলেন, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইন অনুসারে ফাঁসির রায় কার্যকরের দিনক্ষণ ঠিক করার ক্ষমতা সরকারের। তবে সরকার যদি কারা প্রশাসনকে কারাবিধি অনুসারে ব্যবস্থা নিতে আদেশ দেয়, তাহলে রায় পড়ে শোনানোর সাত দিন পর ফাঁসির রায় কার্যকর করা হবে।

কারা সূত্র জানায়, নিয়ম অনুসারে ফাঁসির রায় কার্যকর করার সময় কারা প্রশাসনের মহাপরিদর্শক, কারা তত্ত্বাবধায়ক, জেলার, ঢাকা জেলা প্রশাসক বা তাঁর প্রতিনিধি, ঢাকা মহানগর পুলিশ কমিশনার বা তাঁর প্রতিনিধি, পুলিশের লালবাগ বিভাগের উপকমিশনার ও ঢাকা জেলা সিভিল সার্জন উপস্থিত থাকবেন। ফাঁসি কার্যকর করার পর মৃতদেহটি ২০ মিনিট ঝুলিয়ে রাখা হয়।

ফাঁসির রায় কার্যকর করার ব্যাপারে জানতে চাইলে পুলিশের লালবাগ বিভাগের উপকমিশনার মফিজ উদ্দিন প্রথম আলোকে বলেন, ফাঁসি কার্যকর করার ব্যাপারে গতকাল পর্যন্ত কোনো প্রস্তুতির কথা তিনি জানেন না। এ ব্যাপারে এখনো পুলিশকে কিছু জানানো হয়নি।

এদিকে রায় কার্যকর করার জন্য গত সোমবার থেকেই ফাঁসির মঞ্চ পুরোপুরি প্রস্তুত রাখা হয়েছে। ইতিমধ্যে কয়েক দফা মহড়াও দিয়েছে কারা প্রশাসন। ছয়জন জল্লাদ এখন কারাগারে আছেন, তাঁদের প্রস্তুত থাকতে বলা হয়েছে। তাঁদের যেকোনো তিনজনকে নেওয়া হবে। তবে ফাঁসি কার্যকরের মাত্র এক ঘণ্টা আগে জল্লাদদের এসব তথ্য জানানো হয়ে থাকে। ফাঁসি কার্যকর করার পর মৃতদেহ পুলিশ পাহারায় দাফন করার সিদ্ধান্ত রয়েছে বলে জানা গেছে। তবে এ ব্যাপারে কারা প্রশাসনের কোনো কর্মকর্তা কিছু বলতে রাজি হননি।

একাত্তরে শেরপুরের সোহাগপুর গ্রামে ১৪৪ জনকে হত্যা ও নারী নির্যাতনের দায়ে ২০১৩ সালের ৯ মে কামারুজ্জামানকে ফাঁসির আদেশ দেন ট্রাইব্যুনাল-২। এই রায়ের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টে আপিল করে আসামিপক্ষ। গত বছরের ৩ নভেম্বর সোহাগপুর হত্যাকাণ্ডের দায়ে সংখ্যাগরিষ্ঠ মতে কামারুজ্জামানের ফাঁসির আদেশ বহাল রাখেন আপিল বিভাগ। চলতি বছরের ১৮ ফেব্রুয়ারি আপিল বিভাগের রায়ের পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি প্রকাশিত হলে ৫ মার্চ তা পুনর্বিবেচনার আবেদন করেন কামারুজ্জামান। দুই দফা শুনানি পেছানোর পর গত রোববার আপিল বিভাগে ওই আবেদনের শুনানি হয়।
সূত্রঃ প্রথম আলো।

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s