সাক্ষাৎকার

তাজউদ্দীন আহমদ, [ছাত্র, ফজলুল হক, মুসলিম হল]

সাক্ষাৎকার : ২৬.৪.১৯৬৯

ঢাকাতে আমরা যারা মুসলিম লীগের ‘বামপন্থী’ গ্রুপে ছিলাম তাদের সাথে আবুল হাশিম সাহেবের ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ছিলো। যদিও সুহরাওয়ার্দী সাহেব এবং হাশিম সাহেব একত্রে নাজিমুদ্দীনের বিরুদ্ধে ছিলেন কিন্তু দুইজনের মধ্যে একটা দ্বন্দ্ব বরাবরই ছিলো। ঢাকার পার্টি হাউস এবং তাকে কেন্দ্র করে আমাদের কাজকর্ম সুহরাওয়ার্দী খুব বেশী পছন্দ করতেন না। আমাদের সাথেও তাঁর বিশেষ কোন সম্পর্ক ছিলো না।

দেশভাগের পর আবুল হাশিম বর্ধমান থেকে গেলেন এবং সুহরাওয়ার্দীও ঢাকা এলেন না তার ফলে মুসলিম লীগের নাজিমুদ্দীন বিরোধী বামপন্থী দলের কর্মীরা প্রায় ছত্রভঙ্গ হওয়ার মতো অবস্থা হলো। আবুল হাশিম মুসলিম লীগের সভাপতি হিসেবে যখন নির্বাচন প্রার্থী হন তখন সুহরাওয়ার্দী তাঁকে সমর্থন করেন নি। উপরন্তু ফজলুল হককেই প্রকারান্তরে সাহায্য করেছিলেন। এর ফলে তাঁর এবং আবুল হাশিমের মধ্যে দ্বন্দ্ব বেশ ভালভাবে দেখা দেয়। আবুল হাশিম জুন মাসের দিকেই তিন মাসের ছুটিতে যান এবং তাঁর স্থানে হাবিবুল্লাহ বাহার ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক হিসাবে কাজ করতে থাকেন।

পূর্ব বাঙলার নেতা নির্বাচনের সময় আবুল হাশিম সুহরাওয়ার্দীকে কোন সাহায্য করেন নি এবং অনেকটা তার ফলেই তিনি নাজিমুদ্দীনের কাছে পরাজিত হন। যাই হোক মোট কথা পূর্ব বাংলায় নোতুন সরকার স্থাপিত হওয়ার পর আবুল হাশিম সুহরাওয়ার্দী কেউ ঢাকাতে না থাকায় আমাদের বিরুদ্ধে নাজিমুদ্দীনরা সক্রিয় হয়ে ওঠেন।

১৯৪৭ সালের জুলাই মাসেই কমরুদ্দীন সাহেব, তোহা, অলি আহাদ, আমি এবং আমাদের গ্রুপের অন্যান্যেরা ঠিক করেছিলাম যে সাম্প্রদায়িক কোন রাজনীতি আমরা আর করবো না এবং সে রকম কোন প্রতিষ্ঠানের সাথেও যুক্ত থাকবো না। কাজেই মুসলিম লীগ রাজনীতি না করাই ছিল সিদ্ধান্ত। জুলাই মাসেই আমরা কমরুদ্দীন সাহেবের বাসায় Peoples Freedom League নামে একটা ছোট গ্রুপ গঠন করি। এর মধ্যে ছিলাম আমি, অলি আহাদ, তোয়াহা এবং কমরুদ্দীন সাহেব ছিলেন প্রধান উদ্যোক্তা। এই সময় আমরা গ্রুপ গঠন করার জন্য যে কর্মীদেরকে জমা করেছিলাম তাদের সাথে সমস্ত দিন ধরে আলোচনা চলেছিলো। এই আলোচনাকালে অনেকেই আসা যাওয়া করেছিলো। এদের মধ্যে আহমদ বজলুর রহমান, নুরুল ইসলাম চৌধুরী ছিলো অন্যতম। এইসব আলোচনার মাধ্যমে মোটামুটি কিছু তত্ত্বগত আলোচনা হয়েছিলো এবং একটা গ্রুপ মোটামুটি দাঁড়িয়েছিলো, কিন্তু কোন কমিটি formed হয়নি।

Peoples Freedom League †K Anti-fascist Freedom League এর সাথে যুক্ত করে সরকার পক্ষ থেকে আমাদেরকে নানাভাবে বিরক্ত এবং আমাদের বিরুদ্ধে নানা আই. বি. তৎপরতা বৃদ্ধি করা হচ্ছিলো। এতে করে আমরা নাম পালটে ওটাকে ‘গণ আজাদী লীগ’ নাম দিলাম। প্রথমে ইংরেজীতে একটা ম্যানিফেস্টো জাতীয় জিনিষ ফৎধভঃ করা হয়েছিলো কিন্তু পরে সেটাকে কিছুটা পরিবর্ধিত করে বাংলাতে একটা ম্যানিফেস্টো প্রকাশ করা হয়েছিলো। গণ আজাদী লীগের কাজকর্ম তেমন কিছু হয়নি। তবে পাকিস্তানের আর্থিক জীবনকে নোতুনভাবে দাঁড় করাতে হবে এই বিষয়ে যথেষ্ট চিন্তা ভাবনা ছিলো।

Democratic Youth League এর প্রধান উদ্যোক্ত ছিলেন তসদ্দুক আহমদ। তিনি সিলেট থেকে এসেছিলেন। যারা অসাম্প্রদায়িক রাজনীতি করা স্থির করেছিলো তারাই মোটামুটিভাবে এতে যোগ দিয়েছিলো। শামসুল হক সাহেব এর মধ্যে আসাতে আমরা আশ্চর্য হয়েছিলাম। কিন্তু শামসুল হককে খুব সম্ভবতঃ তসদ্দুক আহমদ এতে রাজী করিয়েছিলো। সম্মেলনে অনেক ডেলিগেট এসেছিলো। এটির জন্যে অন্য কোন জায়গা না পাওয়ায় ঢাকা মিউনিসিপ্যালিটির ভূতপূর্ব ভাইস চেয়ারম্যান খান সাহেব আবুল হাসনাত সাহেবের ৮ নম্বর নূর বক্স লেনের বাড়ীতেই শেষ পর্যন্ত সম্মেলন হয়েছিলো। তিনি বরাবর ছিলেন জাতীয়তাবাদী মুসলমান এবং সেই হিসাবে মুসলিম লীগ বিরোধী। আমাদেরকে তাঁর জায়গা দেওয়ার এটাই অন্যতম কারণ ছিলো।

Democratic Youth League এ যারা যোগদান করেছিলো তাদের মধ্যে প্রায় সকলেই আবুল হাশিম সাহেবের সাথে মুসলিম লীগে কাজ করতো। এছাড়া কিছু সংখ্যক অন্যান্য প্রগতিশীল কর্মীরাও ছিলেন। যারা এই সম্মেলনে এসেছিলেন তাঁদের দুই একজনের ছাড়া অন্য কারো সাথে সুহরাওয়ার্দী সাহেবের বিশেষ যোগ ছিলো না।
আমি নিজে আগে রাজনীতি করতাম কিন্তু ছাত্র রাজনীতির সাথে বিশেষ যুক্ত ছিলাম না। আমি সরাসরি মুসলিম লীগ রাজনীতিই করতাম। দেশভাগের পর অবশ্য আমাদের মতো অনেক মুসলিম কর্মী আবার নোতুন করে ঢাকাতে এসে পড়াশোনা আরম্ভ করেছিলো। আমিও আরম্ভ করেছিলাম কিন্তু তখনো ছাত্র রাজনীতির সাথে বিশেষভাবে জড়িত না হয়ে আমি সরাসরি রাজনীতিতেই নামার চেষ্টা করি।

এই সময় Democratic Youth League এর যারা যোগ দিয়েছিলেন তাদের বাইরের কিছু মুসলিম লীগ কর্মী, প্রধানতঃ শেখ মুজিবর রহমান প্রভৃতি মুসলিম লীগকে পুনর্গঠনের কাজে যোগ দেওয়ার চেষ্টা করার জন্যে Muslim League Worker’s Camp নাম দিয়ে কর্মীদের একটা সম্মেলনের মতো করেছিলেন। আমরা তাতে যাইনি কিন্তু শামসুল হক তার মধ্যে ছিলেন।
এদের উদ্যোগেই পরে নারায়ণগঞ্জে একটা সম্মেলন হয়। এর Reception Committee এর চেয়ারম্যান ছিলেন খান সাহেব ওসমান আলী এবং সভাপতি মৌলানা ভাসানী। এই সম্মেলনে আমি গিয়েছিলাম। সেখানে স্থির হয়ে যে খালিকুজ্জামানকে রশিদ বইয়ের জন্য বলা হবে। এর জন্যে delegation ঠিক হয় পাঁচজনের। যার মধ্যে আতাউর রহমান খান, মিসেস আনোয়ারা খাতুন, খয়রাত হোসেন প্রভৃতি ছিলেন। এঁরা করাচী গিয়ে খালিকুজ্জামানের সাথে আলাপ করেছিলেন এবং তাঁদেরকে কিছুটা আহ্বানও দেওয়া হয়েছিলো।

শেষ পর্যন্ত কিন্তু দেখা গেলো যে মুসলিম লীগের মধ্যে রাজনীতি করার কোন সম্ভাবনা আমাদের নেই এবং সরাসরি অন্য রাজনীতির তেমন কোন পথ আমাদের জন্যে খোলা নেই। এমতাবস্থায় ছাত্র রাজনীতির মধ্যে ঢোকাই আমরা স্থির করলাম। এইভাবেই ছাত্রদের মধ্যে এক নোতুন রাজনৈতিক তৎপরতা শুরু হলো। যারা পূর্বে রাজনীতি করতে গিয়ে পড়াশোনা বাদ দিয়েছিলো তারাই আবার নোতুন করে পড়াশোনা শুরু করে ছাত্র রাজনীতির সাথে জড়িত হলো।

এই সময় পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র লীগ গঠন করা যায় কিনা সেটা বিবেচনার জন্যে কিছু কর্মীদেরকে নিয়ে আলোচনা করা স্থির হয় এবং তার প্রস্তুতি হিসেবে একটা লিফলেট তৈরী করা হয়, মোয়াজ্জেম হোসেন চৌধুরী তখন ছিলো F. H. Hall

এর V. P.। আমাদের সাথে তার একটা ভালো যোগাযোগ হয় এবং তাকে আমরা এই মিটিং এর সভাপতি করার সিদ্ধান্ত করি। মিটিং F. H. হলেই ডাকা হলো।
এই মিটিং হওয়ার কথা ছিল একদিন বেলা তিনটের সময় Provost এর অফিসের পাশের ঘরেই। তার কিছুক্ষণ পূর্বে শাহ আজীজেরা, সুলতান হোসেন খান, সালেক, মতিউর রহমান (ইব্রাহিম, আলাউদ্দীন Ñ আমার) প্রভৃতি বেশ কয়েকজন এবং রুকনপুর কলতাবাজারের আরও কয়েকজন গু-াকে মিটিংএ পাঠালো এবং তারা প্রস্তাব করলো যে সালেক সভাপতি হবে। মিটিংএর নির্ধারিত সময়ের পূর্বে এই কা- হওয়াতে কেউই এর জন্য প্রস্তুত ছিলো না। তবু হঠাৎ সালেকের নাম প্রস্তাব করার হেদায়েত, ইসমাইল, মোয়াজ্জেম (যার সভাপতিত্ব করার কথা পূর্বে ঠিক ছিলো) এবং অন্যান্য ছাত্রেরা দারুণ ক্ষেপে গেলো এবং সালেককে ধরে তারা দারুণভাবে মারপিট করতে শুরু করলো। গু-ারা প্রকৃত পক্ষ ছাত্রদের কাছে মার খেয়ে হেরে যাওয়ার উপক্রম হলো। সালেকের শরীর মারের আঘাতে রক্তাক্ত হয়ে গেলো। সে অবশেষে দৌড়ে পালিয়ে গিয়ে কাছাকাছি এক বাড়ীতে আশ্রয় নিলো।

এই ঘটনার প্রায় ৪৫ মিনিট পর দুটো ট্রাকে করে আরও অনেক গু-া এসে ছুরি ছোরা সহ হলের মধ্যে প্রবেশ করলো। তারা মারপিট শুরু করার পূর্বেই হলের পশ্চিমা দারোয়ান তাড়াতাড়ি ছাত্রদেরকে গেটের মধ্যে ঢুকিয়ে দরজা বন্ধ করে দিলো। আমরা কয়েকজন বাইরে আটকা পড়ে গিয়েছিলাম। ঠিক সেই সময় প্রভোস্ট মাহমুদ হোসেন এসে গু-াদেরকে ধমকে তাড়িয়ে দেন।
যে ট্রাক দুটো করে গু-ারা এসেছিলো তার মধ্যে একটি ছিলো Civil Supply ডিপার্টমেন্টের। এটা আমরা জানতে পারি এজন্যে যে দুটো ট্রাকের নম্বরই আমরা সে সময় টুকে রেখেছিলাম। এর মধ্যে একটা Civil Supply এর জানতে পেরে আমরা তৎকালীন Civil Supply মন্ত্রী নূরুল আমীনের বাড়ীতে গিয়ে সমস্ত ব্যাপারটির প্রতিবাদ করি এবং অপরাধীদের শাস্তি দাবী করি। তিনি কিন্তু বললেন যে Civil Supply ডিপার্টমেন্টের কোন কর্মচারীর ছেলে যদি ট্রাক ব্যবহার করে থাকে তো তিনি কি করতে পারেন। আমরা বললাম, আপনাকে তো আমরা ট্রাকের নম্বর পর্যন্ত দিচ্ছি তার থেকে তো অনায়াসে আপনি কে একাজ করেছে সেটা বের করতে পারেন। কিন্তু নূরুল আমীন শেষ পর্যন্ত কিছুই করেন নি কারণ তাঁদের নিজেদের লোকজনেই এ কাজ করেছিলো। এই ঘটনার সাথে আমাদের তরফ থেকে তোয়াহা, অলি আহাদ, নঈমুদ্দীন, কাজী গোলাম মাহবুব, আবদুর রহমান চৌধুরী প্রভৃতি জড়িত ছিলো।
ভাষার প্রশ্ন বিবেচনার জন্যে ১৯৪৭ এর শেষের দিকে আমরা ফজলুল হক হলে একত্রিত হয়েছিলাম (নভেম্বর কিনা মনে নেই)। সে সময় উপস্থিত ছিলেন শামসুল হক, কমরুদ্দীন আহমদ, তোয়াহা, অলি আহাদ, লিলি খান, শহীদুল্লাহ কায়সার, আবুল কাসেম, অজিত গুহ (?) রণেশ দাশগুপ্ত। এ মিটিংএ সংগ্রাম কমিটি সম্পর্কে আলোচনা হয়েছিলো কিন্তু কোন কমিটি হয়নি। কাসেম সাহেব অজিতবাবুর নাম দিয়ে কোন আপত্তি করেছিলেন কিনা স্মরণ নেই। হিন্দু এবং কমিউনিস্টদের বিরুদ্ধে তিনি প্রায়ই নানা রকম আপত্তিজনক কথা বলতেন। তাদেরকে নিলে আন্দোলনের ক্ষতি হবে এ কথাও তিনি বলতেন। তাই অজিত বাবু সম্পর্কে এ ধরনের মন্তব্য খুব স্বাভাবিক।

কাসেম সাহেব এই তমদ্দুন মজলিস নামে একটা সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান করেছিলেন। তার অফিস ছিলো বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছে রশিদ বিল্ডিং নামে একটা বাড়ীর একটা কামরায়। এই সময়ে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার কথা না বলে তাঁরা বাংলাকে কোর্ট বা আদালতের ভাষা করা দরকার এই মর্মে আন্দোলন করছিলেন।
রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের সময় পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম লীগ ভালভাবে সংগঠিত হয়নি। তবে নঈমুদ্দীন আহমদ তার কনভেনর হিসাবে ভাষা আন্দোলনে খুব সক্রিয় অংশ গ্রহণ করেন। ভাষা আন্দোলন ছাত্র লীগ গঠনকে খুব সাহায্য করে।

১১ই মার্চের ধর্মঘটের পূর্ব দিন ফজলুল হক হলে এক মিটিং হয় এবং তাতে পর দিনের কর্মসূচী সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা হয় এবং কে কোন জায়গায় পিকেটিং করতে যাবে সেটাও ঠিক হয়। ইডেন বিল্ডিং এর ১ম ও ২য় গেট, রমনা পোস্ট অফিস, পলাশী ও নীলক্ষেত ব্যারাক, জেলা কোর্ট, রেলওয়ে ওয়ার্কশপ ইত্যাদির সামনে পিকেটিং এর ব্যবস্থা হয়। রেলওয়ে ওয়ার্কশপের পিকেটিং এর জন্য তিনটি পয়েন্ট ঠিক করা হয়। রেলওয়ে হাসপাতালের সামনে এবং পাশে, দুটো রেলওয়ে ক্রসিংএ এবং আবদুল গনি রোডের দিক থেকে ওয়ার্কশপে প্রবেশের পথে। পিকেটিং অবস্থায় কেউ কেউ গ্রেফতার হলে তাদেরকে replace করার ব্যবস্থাও ঠিক হয়। এটা করা হয় এ জন্যে যাতে গ্রেফতারের পর পিকেটিং থেমে না যায়।

সেলিমুল্লাহ হল সে সময় আন্দোলনে সব সময় পিছিয়ে থাকতো। একমাত্র V. P নজরুল ইসলাম এবং শামসুল আলম ব্যতীত অন্য কোন নেতৃস্থানীয় ছাত্রকে আমরা পাইনি। ফজলুল হক হল, ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ এবং মেডিকেল কলেজই এ ব্যাপারে বিশেষভাবে সক্রিয় ছিলো। এই সময় কমরুদ্দীন আহমদ খুব সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন।

১১ই মার্চ খুব ভোর থেকে ছাত্রেরা পিকেটিং এর জন্যে বেরিয়ে পড়ে। রেলওয়ে ওয়ার্কশপে কাজ আরম্ভ হতো ভোর ৫টা থেকে। কাজেই ছাত্রেরা ৫টার পূর্বেই সেখানে পিকেটিং এর জন্য উপস্থিত হন। এ ছাড়া যে যে এলাকায় যখন অফিস বসার কথা অথবা অফিসের জন্য লোকজনের বের হওয়ার কথা (নীলক্ষেত ও পলাশী ব্যারাক) সেখানে সময়মতো উপস্থিত হয়েছিলো।
সরদার ফজলুল করিম ও আমি সেদিন বেশ কিছুক্ষণ একসাথে ছিলাম। তিনি আমাকে নেতাদের সাথে ঘুরতে নিষেধ করেছিলেন কারণ তাঁর ধারণা ছিলো যে কিছু নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি ও ছাত্রেরা তাড়াতাড়ি গ্রেফতার হয়ে নাম অর্জনের চেষ্টা করবেন এবং ফলে সকলে সেইভাবে গ্রেফতার হলে আন্দোলন বানচাল হবে। কাজেই গ্রেফতার যাতে না হই তার জন্য সাবধান থাকতে হবে।

ছাত্রেরা নিজের হল থেকে batch by batch বেরিয়ে পিকেটিং এর জন্যে বেরিয়ে পড়লো। তারা সেদিন মিছিল করে সকালের দিকে বের হয়নি। সকালে কোন মিটিংও হয়নি। প্রথম batch এ শামসুল হক, মুজিবর রহমান, অলি আহাদ এবং আরও অনেকে গ্রেফতার হন।

আমি এবং ফজলুল করিম সকালে রমনা পোস্ট অফিসের সামনে গিয়ে দেখি যে ১৩/১৪ জন ছাত্রসহ তোয়াহা সাহেবকেও ঝ. চ. গফুর আটকে রেখেছে। আমরা তোয়াহা সাহেবের সাথে সামান্য কথা বলে তাড়াতাড়ি সেখান থেকে সরে পড়লাম। পরে তোয়াহা সাহেব S. P. গফুরের সাথে অনেকক্ষণ তর্কাতর্কি করে সেখান থেকে কেটে পড়েছিলেন।
১১ই মার্চ বিকেলের দিকে ১-৩০ মি: Ñ ২টার মধ্যে ইউনিভার্সিটি আমতলায় মিটিং হয়। বক্তাদের মধ্যে দবিরুল ইসলামের কথা মনে আছে।
আমি নিজে সংগ্রাম কমিটির সদস্য নিশ্চয়ই ছিলাম কারণ কায়েদে আজমের সাথে যখন দেখা করি তখন সেই হিসাবেই আমি ডেলিগেশনভুক্ত হয়েছিলাম।

নাজিমুদ্দীনের সাথে সংগ্রাম কমিটির যে আলোচনা হয় তাতে আমি উপস্থিত ছিলাম না। তবে অন্যদের কাছে শুনেছিলাম যে ৮ নং শর্তটি নাজিমুদ্দীন স্বহস্তে লিখেছিলেন। সর্তটি ছিলো নি¤œরূপ ঃAfter consultation with the member of the Committee of Action I am satisfied that this meeting has not been sponsored by the enemies of the state..”। এই document আবদুর রহমান চৌধুরীর কাছে ছিলো। কিন্তু পরে সেটা আর পাওয়া যায়নি।
১৫ই মার্চ ১১টার দিকে সংগ্রাম কমিটির সাথে নাজিমুদ্দীনের আলোচনা হয়েছিলো। তবে ১৬ তারিখের ঘটনার পর খুব সম্ভবতঃ তিনি সংগ্রাম কমিটির সদস্যদের সাথে গ-গোলের বিষয় নিয়ে আবার আলাপ করেছিলেন।

১৬ তারিখে ইউনিভার্সিটিতে যে মিটিং ছিলো তাতে কে Preside করেছিলো মনে নেই। তবে সে মিটিং এ হঠাৎ মুজিবর রহমান অন্য কাউকে বক্তৃতার সুযোগ না দিয়ে নিজে দাঁড়িয়ে অল্পক্ষণ বক্তৃতা করেই, ‘চলো চলো Assembly চলো’ বলে শ্লোগান দিয়ে মিটিং ভেঙে দিলো এবং সকলকে সেদিকে divert করেছিলো। তার বক্তৃতার সারমর্ম কিছুই ছিলো না এবং তার এই আচরণে অন্য অনেকে খুব অসন্তুষ্ট হয়েছিলো। কিন্তু মিটিংকে এর পর আর রক্ষা করা সম্ভব হলো না। সকলে Assembly দিকে অগ্রসর হলো। চৌরাস্তার কাছে গিয়ে আমরা বাধা পেলাম এবং তার পর ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের দিকে মোড় নিলাম। তারের বেড়া ফাঁক করে করে আমরা ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের কম্পাউন্ডের মধ্যে ঢুকে Assembly সামনে কলেজ এলাকার দিকে এসে দাঁড়ালাম। অধিবেশন চলাকালে বাইরে দারুণ গ-গোল হচ্ছিলো। এই সময় থেকে কোন কোন সদস্য মাঝে মাঝে বের হয়ে এসে ছাত্রদের কাছে মুখ দেখিয়ে যাচ্ছিলেন। এর মধ্যে হাতিয়ার মৌলানা আবদুল হাইয়ের কথা আমার ভালো মনে আছে। যাতে বের হয়ে ছাত্রদের কাছে মার খেতে না হয় তার জন্যে বার বার তিনি হাত নেড়ে ব্যালকনির উপর থেকে বলছিলেন, ‘চালাও, চালাও, আমরা আছি’ ইত্যাদি।

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s