সাক্ষাৎকার

সৈয়দ নজরুল ইসলাম
[ছাত্র, সেলিমুল্লাহ মুসলিম হল]

সাক্ষাৎকার ২০.৯.১৯৬৯

আমি ১৯৪৮ সালে সেলিমুল্লাহ মুসলিম হলের ভাইস প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হই।
১৯৪৩ এর দিকে আবুল হাশিম সাহেব মুসলিম লীগের সেক্রেটারী হওয়ার পর মুসলিম ছাত্রদের মধ্যে একটা দারুণ উদ্দীপনার সৃষ্টি হয়। এর পর থেকে মুসলমান ছাত্রদের মধ্যে মুসলীম লীগের প্রভাব খুব বৃদ্ধি পায়।

নাজিমুদ্দীন এবং আবুল হাশিমকে কেন্দ্র করে কিছুটা ব্যক্তিগত এবং কিছুটা আদর্শগত কারণে ছাত্রেরা বিভক্ত হয়। ছাত্রদের মধ্যে দেশভাগের পূর্বে ঢাকা জেলায় মোটামুটিভাবে শাহ আজিজের প্রভাবই বেশী ছিলো।

আমরা অর্থাৎ আমি এবং তোয়াহা সাহেব যখন দুই হলের ভি. পি. নির্বাচিত হই তখন অবশ্য আমাদের প্রভাব ছাত্রদের মধ্যে অনেক বৃদ্ধি পায়।
আমাদের গ্রুপে কলকাতা থেকে আসা যে সমস্ত ছাত্র ছিলো তাদের মধ্যে আবদুর রহমান চৌধুরী, মোল্লা জালালউদ্দীন প্রভৃতি ছিলো।
ঢাকাতে ছাত্রদের accommodation ইত্যাদি নিয়েই প্রথম আন্দোলন শুরু হয়। তারপর তা ক্রমশঃ রাজনৈতিক চরিত্র নেয়।
পাকিস্তান হওয়ার পর কোন policy declare না করেই তারা এখানে উর্দু চালাতে শুরু করলো। স্ট্যাম্প, রেল টিকিট, টাকা, মনি অর্ডার ফর্ম ইত্যাদিতে।
এই সময় আবুল কাসেম, এ. কে. এম. আহসান দুজন ১৯ আজিমপুরে একসাথে থাকতেন। তাঁরাই এ ব্যাপারে প্রথম উদ্যোগ নেন। আমাদের সাথে S. M. Hal এর west house এর একটা কামরায় একদিন তাঁরা এই নিয়ে আলাপ করলেন।

আমরা এর পর ১৯ আজিমপুরে একটি বৈঠকে মিলিত হই। শামসুল আলম (Assistant Sales Officer, EPIDC), আমি, মতিন চৌধুরী, আহসান, কাসেম, নূরুল হুদা (ইঞ্জিনিয়ারিং স্কুল) সেখানে ঠিক করলাম যে এর প্রতিবাদ করতে হবে। তবে এটাও ঠিক হলো যে সেই প্রতিবাদের পূর্বে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার যৌক্তিকতা দিয়ে একটা পুস্তিকা বের করা উচিৎ। কাসেম সাহেব নিজে লিখতে সম্মত হলেন। এছাড়া কাজী মোতাহার হোসেনকে বলা হলে তিনিও রাজী হলেন। আবুল মনসুর সাহেবকে চিঠি দেওয়া হলে তিনিও একটা লেখা দিলেন। ওটা ছাপা হলো। কিন্তু আমরা সেটা বিক্রী করার সময়ে সকলে সেটা কিনতে চাইতো না। অনেকেই আপত্তি করতো।
এই বই প্রকাশিত হওয়ার পর রশিদ বিল্ডিংএ একটা সভা হয়। দুতলায় অন্ধকার একটা ঘরে। সেখানে শিল্পী জয়নাল আবেদিনও উপস্থিত ছিলেন। অন্যদের মধ্যে আমি, তোয়াহা, অলি আহাদ, কাসেম, খালেক নওয়াজ, নঈমুদ্দীন প্রভৃতি। ফরিদ আহমদ সেখানে উপস্থিত ছিলো না।
এই সভাতেই ভাষা প্রশ্ন নিয়ে একটা ধর্মঘটের চেষ্টা নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়।

২৬শে ফেব্রুয়ারীর পর একটা সংগ্রাম কমিটি গঠিত হলো। তাতে ছিলেন তোয়াহা, কাসেম, অলি আহাদ, লিলি খান, কমরুদ্দীন, শামসুল আলম, নূরুল হক ভুঁইয়া (কনভেনর)।
১১ই মার্চ তোয়াহা, খালেক নওয়াজ প্রভৃতি মার খান। তারপর থেকেই ভাষা আন্দোলনের সপক্ষে গণসমর্থন বৃদ্ধি পায়। এর ফলে শাহ আজিজদের প্রতিরোধও ভেঙ্গে পড়ে। এই সময় তাদের বিছানাপত্র সাধারণ ছাত্রেরা হলের থেকে বের করে বাইরে ফেলে দিয়েছিলো।
১৪ তারিখের রাত্রে নাজিমুদ্দীনের রাজনৈতিক সেক্রেটারী কুমিল্লার মফিজউদ্দীন আহমদ আমাদের সাথে কথাবার্তা শুরু করলো। সে ভদ্রলোক রাত্র ১টার সময় S. M. Hall আমার সঙ্গে দেখা করলো।

পরদিন সকালে আমি, কমরুদ্দীন, কাসেম, শামসুল আলম (?) প্রভৃতি ফজলুল হক হলে বসলাম। কমরুদ্দীন সাহেব চুক্তিপত্রের খসড়া তৈরী করলেন। কাসেমও তার মধ্যে ছিলেন। যাই হোক ফজলুল হক হল থেকে আমরা কয়েকজন নাজিমুদ্দীনের বাড়ীতে গেলাম। আজিজ আহমদকে নিয়ে একটা গ-গোল হয়েছিলো কিন্তু তার কোন বিবরণ আমার মনে নেই।
নাজিমুদ্দীনের সাথে চুক্তি সম্পর্কে সিদ্ধান্তে আসার পর আমরা জেল গেটে গেলাম ১২-৩০/১ টার দিকে জেলে আটকদেরকে সেটা দেখানোর জন্য। তারা সেটা দেখলো এবং approve
করলো। তারপর আমরা আবার নাজিমুদ্দীনের কাছে গেলাম। সই হলো, সরকার পক্ষে নাজিমুদ্দীন এবং কমিটি অব অ্যাকশনের পক্ষে শামসুল আলম (?) সই করলেন।
১৫ কি ১৬ তারিখ মনে নেই। ছাত্রদেরকে চুক্তির কথা বোঝাতে গিয়ে বিপদ হলো। তারা সেটা মানতে চাইলো না। বললো আন্দোলনকে betray করা হয়েছে। যারা এইভাবে চীৎকার করেছিলো তাদের মধ্যে মুন্সীগঞ্জের শামসুদ্দীনও ছিলো।

১৬ তারিখের মিটিংএ শেখ মুজিব সভাপতিত্ব করেছিলো। কিন্তু সে সময় তাঁর সেই রকম কোন সভায় সভাপতিত্ব করার মত Position ছিলো না। যাই হোক আমরা সেখানে বললাম যে চুক্তি করা হয়েছে কাজেই চুক্তি মানতে হবে। কিন্তু মুজিব, খালেক নওয়াজ প্রভৃতি অন্যরকম পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে চাইলো। তারা ‘চলো চলো অ্যাসেম্বলী চলো’ বলে শ্লোগান দিয়ে ছাত্রদেরকে সেখান থেকে মিছিল করে অ্যাসেম্বলীর দিকে নিয়ে গেলো।

এর পর পরিষদ ভবনের সামনে লাঠি চার্জ ইত্যাদি হলো। আমরাও সেখানে উপস্থিত ছিলাম। সেদিন S. M. Hall অনেক এম. এল. এ.কে বেইজ্জত করা হয়েছিলো। সেদিনকার আক্রমণ প্রধানতঃ এম. এল. এ.দের বিরুদ্ধেই কেন্দ্রীভূত হয়েছিলো।

কায়েদে আজম যখন ঢাকাতে ছাত্রদের সাথে দেখা করলেন তখন আমিও তাদের সাথে ছিলাম। আলাপ খুব স্বল্পকাল স্থায়ী হয়েছিলো। সকলে বেরিয়ে আসার পর আমাকে এবং তোয়াহাকে আবার একবার ভিতরে ডেকে নিয়ে গিয়েছিলো এ কথা মনে আছে কিন্তু কি আমাদের বলা হয়েছিলো সেটা মনে নেই।
২৪শে তারিখে সংগ্রাম কমিটির সাথে কায়েদে আজম দেখা করেন। তার মধ্যে আমি ছিলাম। অন্যদের মধ্যে তোয়াহা, কমরুদ্দীন, অলি আহাদ, শামসুল হক, কাসেম, নুরুল হুদা (ইঞ্জিনিয়ার)।

সেই সময় মুশতাক সাহেব থাকার কথা আমার মনে পড়ে না। তিনি ছিলেন না।
শামসুল হকের নামাজ পড়া নিয়ে একটা গ-গোল হয়।
সেই আলোচনার সময় কায়েদে আজম অনেক অযৌক্তিক কথা বলেন।

Q. A. : I dream of a Pakistan where there will be one people speaking one language having one culture from peshawar to Chittagong.
এর উত্তরে কে একজন বলেন যে কায়েদে আজম যা বলছেন তা হয় না। কারণ ভৌগোলিক, ঐতিহাসিক, ঐতিহ্যিক ইত্যাদি অনেক ব্যাপার আছে যেগুলিকে উড়িয়ে দিয়ে সব কিছু একাকার করা সম্ভব নয়।

এ কথায় কায়েদে আজম রেগে ওঠেন। তিনি বলেন সময়ে সব কিছুই পরিবর্তিত হতে পারে।
এই সময় আনসার আলী একটা শার্ট ও প্যান্ট পরে ছিলো। তাকেই দেখিয়ে তিনি বলেন, তুমি এখন প্যান্ট পরে আছো কিন্তু তোমার দাদোর পোষাক তো তা ছিলো না। কাজেই সময়ের সাথে সাথে সব কিছুই এইভাবে পরিবর্তিত হয়।

একুশে তারিখে কায়েদে আজমের বক্তৃতা শোনার পর S. M. Hall এর সামনে যে গেট তৈরী করা হয়েছিলো ছাত্রেরা সেটা ভেঙে ফেলে দিলো। এই রকম আরো গেট সেদিন লোকে ভেঙে দিয়েছিলো।

২৪শে কনভোকেশনে যারা No No বলেছিলো তাদের মধ্যে বর্তমান D. I. G আবদুর রহিম ছিলো অন্যতম।
কায়েদে আজমের অভ্যর্থনা কমিটি নিয়ে একটা ব্যাপার হয়েছিলো। অভ্যর্থনা কমিটি করার জন্যে নাজিমুদ্দীন তাঁর সেক্রেটারিয়েট অফিসে অন্যদের সাথে হলের V. P. ও সেক্রেটারীদেরকেও ডাকলেন। আমরা সেখানে বললাম কায়েদে আজমের অভ্যর্থনার জন্য কমিটি সর্বদলীয় হওয়া দরকার। আমরা বললাম আতাউর রহমান খানকেও তার সদস্য করা হোক। এই কথায় নাজিমুদ্দীন বিশেষ আপত্তি করতে পারলেন না। তিনি সেইভাবেই একটা কমিটি গঠন করলেন।

কিন্তু ঠিক সেই সময়ে নূরুল আমিন এবং হামিদুল হক সেখানে উপস্থিত হয়ে সমস্ত কিছু বানচাল করে দিলেন। তাঁরা যুক্তি দিলেন যে তখনকার সেই বৈঠক প্রতিনিধিত্বমূলক নয় কাজেই সেখানে অভ্যর্থনা কমিটি গঠন করা চলে না। পরের দিন ভালভাবে সেই কমিটি গঠনের জন্য ডিস্ট্রিক্ট বোর্ড হলে সভা আহ্বান করা হলো। নাজিমুদ্দীন তাতে সভাপতিত্ব করলেন।
কাসেম, আমি, তোহায়া, কাজী গোলাম মাহবুব, খালেক নওয়াজ প্রভৃতি সকলে গেলাম। নবাব হাবিবুল্লাহ, নাজিমুদ্দীন, মোহন মিঞা প্রভৃতিরাও সকলে উপস্থিত ছিলেন। শামসুল হুদা, আলাউদ্দীন প্রভৃতির নেতৃত্বে সেই সভা উপলক্ষ্যে দারুণভাবে গু-ার ব্যবস্থা করা হয়েছিলো। তারা আমাদের পাশে পাশে বসে চাকু ছুরি ইত্যাদি দেখাচ্ছিলো।
সেদিন মহম্মদ ওয়াসেকই প্রধান বক্তা ছিলেন। তিনি বললেন যারা মুসলিম লীগের লোক নয়, পাকিস্তানের শত্রু তাদেরকে নিয়ে অভ্যর্থনা কমিটি করা চলে না ইত্যাদি।
গু-াদের দিকে চেয়ে আমরা বিশেষ কিছু বলতে পারলাম না। কাসেম সাহেব একবার কি বলতে উঠলেন কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে তাঁর উপর জুতো ছোঁড়া হলো।
যাই হোক এই সময় অন্য সকলকে বাদ দিয়ে দুই হলের V. P হিসাবে একমাত্র তোয়াহা এবং আমাকে নিয়ে একটা অভ্যর্থনা কমিটি গঠন করলো। আতাউর রহমান, কামরুদ্দীন আহমদ প্রভৃতিকে বাদ দেওয়া হলো।

সেই মিটিং এর পর গু-ারা আমাদের পিছু নিলো। খালেক নওয়াজ এবং গোলাম মাহবুব দৌড়ে University-তে হলের দিকে গিয়ে সেখানে উঠলো।
তোহায়া এবং আমাকে নেওয়া সত্ত্বেও আমরা অভ্যর্থনা কমিটির সাথে কোন যোগাযোগ রাখলাম না।
আমরা অবশ্য কায়েদে আজমের অভ্যর্থনার জন্য ছাত্র হিসাবে বিমান বন্দরে গিয়েছিলাম।

ঢাকায় প্রথম বিরোধী পক্ষীয় public meeting হয় S. M. Hal এর লনে। সেই সভায় ভাসানী এবং ইখতিখারউদ্দীন বক্তৃতা দেন। আমি তখন S. M. Hall এর V. P.। এই মিটিং করার দায়িত্ব আমি নিয়েছিলাম। সেজন্যে তারপর আমাকে expe করা হবে না কেন সেটা জানতে চেয়ে V. C. কৈফিয়ৎ তলব করেন। সেই সময় Provost মোয়াজ্জেম হোসেন আমাকে রক্ষা করেন।

ছাত্রলীগের প্রথম প্রেসিডেন্ট ঃ দবিরুল ইসলাম, প্রথম সেক্রেটারী ঃ খালেক নওয়াজ খান।

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s