চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য্য

চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য্য (জন্ম ৩৪০ খ্রিষ্ট পূর্ব, শাসনকাল ৩২০-২৯৮ খ্রিষ্টপূর্ব) ছিলেন ভারতে মৌর্য্য সাম্রাজ্যের প্রতিস্ঠাতা। তিনি ভারতীয় উপমহাদেশের প্রায় অধিকাংশ অঞ্চল জয় করেছিলেন। তাকে অবিভক্ত ভারতের প্রতিস্ঠাতা এবং ভারতের প্রথম সম্রাট হিসেবে ইতিহাসে স্থান দেওয়া হয়। তার শাসন প্রতিস্ঠিত ছিলো পূর্বে বাংলা থেকে আসাম, পশ্চিমে আফগানিস্তান থেকে বেলুচিস্তান, উত্তরে কাশ্মির থেকে নেপাল এবং দক্ষিণে ডেক্কান উপত্যকা পর্যন্ত্য। মাত্র বিশ বছর বয়সে তিনি নন্দ সাম্রাজ্যের পতন ঘটিয়ে দিগ্বিজয়ী আলেজান্ডারের সেনাপতি ও তৎকালীন মেসডোনীয় সাম্রাজ্যের অধিকর্তা সেলুকাসের সাথে সমঝোতার ভিত্তিতে সমগ্র দক্ষিণ এশিয়ায় তার শাসন প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।

চন্দ্রগুপ্তের বংশ পরিচয় নিয়ে মতান্তর আছে। কেউ মনে করেন, তিনি কোন নন্দ যুবরাজ ও তার পরিচারিকা মুরা’র সন্তান ছিলেন। মৌর্য্য কথার উৎপত্তি মুরা থেকেই। কেউ কেউ আবার মনে করেন তিনি নেপালের তরাই অঞ্চলের এক প্রজাতন্ত্রের থেকে এসেছিলেন। আবার কেউ কেউ আবার মনে করেন তিনি গান্ধার অঞ্চলের এক প্রজাতন্ত্রের থেকে এসেছিলেন। প্রাচীন স্ংস্কৃত সাহিত্যিক বিশখাদত্ত তার নাটকে চন্দ্রগুপ্তকে মৌর্যপুত্র ও নন্দজায়া হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। আবার অনেক মধ্যযযুগীয় সাহিত্য ধারায় তাকে নন্দ বংশের রাজপুত্র ও এক দাসীর পুত্র হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। বৌদ্ধ সাহিত্যে তাকে ক্ষত্রিয় বংশের সন্তান হিসেবে ধারনা করা হয়।

বিভিন্ন সংস্কৃত স্তোত্র থেকে জানা যায়, সেসময় তক্ষশীলা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ক্ষুরধার বুদ্ধিসম্পন্ন ব্রাহ্মণ ছিলেন। তার নাম ছিল চানক্য। তিনি কৌটিল্য নামেও পরিচিত ছিলেন। জৈন গ্রন্থ থেকে জানা যায়, তিনি কোন কারণে নন্দ রাজাদের দ্বারা অপমানিত হন, তিনি তখন থেকে এর প্রতিশোধ নেবার চেষ্টা করতে থাকেন। এই সময় তিনি বালক চন্দ্রগুপ্ত দেখেন। তার মনে হয় এই বালকের মধ্যে রাজা হবার সবগুণ আছে। তিনি তাকে তক্ষশীলা নিয়ে যান ও বিভিন্ন বিদ্যায় পারদর্শী করে তোলেন। জৈন গ্রন্থ ও বিশাখাদত্তের মুদ্রারাক্ষস থেকে জানা যায়, চন্দ্রগুপ্তের সঙ্গে হিমালয়ের পার্বত্য অঞ্চলের রাজা পার্বতকের সাথে মৈত্রী চুক্তি হয়। কোন জায়গায় একে আবার রাজা পুরু বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

নন্দরাজাদের সঙ্গে যুদ্ধে প্রথমে সাফল্য না পেলে চানক্য কৌশল পরিবর্তন করে নন্দ সাম্রাজ্যের প্রান্তিক প্রদেশগুলো আক্রমণ করা শুরু করেন, এতেই সাফল্য আসে। নন্দ সেনাপতি ভদ্রশালা ও ধননন্দকে একের পর পর যুদ্ধে পরাজিত করে চন্দ্রগুপ্তের বাহিনী রাজধানী কুসুমপুরা অবরোধ করে। আনুমানিক ৩২১ খ্রীষ্টপূর্বাব্দে মাত্র ২০ বছর বয়সে চন্দ্রগুপ্ত নন্দ সাম্রাজ্যের পতন ঘটিয়ে মৌর্য সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠা করেন। এইভাবেই তিনি এত অল্প বয়সেই পূর্বে আসাম ও বাংলা থেকে পশ্চিমে সিন্ধু উপত্যকা পর্যন্ত বিশাল সাম্রাজ্যের অধিকারী হন।

এরপর চন্দ্রগুপ্ত ভারতের পশ্চিম সাম্রাজ্যের বিস্তারে উদ্যোগী হন। সেসময় সেলুকাস আই নিকাটর, আলেকজান্ডারের সাম্রাজ্যের ব্যকট্রিয় থেকে সিন্ধু উপত্যকা পর্যন্ত বিস্তীর্ণ অঞ্চল শাসন করছেন। চন্দ্রগুপ্তের সাথে ৩০৫ খ্রীষ্টপূর্বে তার যুদ্ধ শুরু হয়, পরে তাদের মধ্যে মৈত্রী চুক্তি সাক্ষরিত হয়। মনে করা হয়ে থাকে, এর ফলে হিন্দুকুশ পর্বত ও বেলুচিস্থান পর্যন্ত দীর্ঘ অঞ্চল তাঁর অধীনে আসে। বিনিময়ে চন্দ্রগুপ্ত সেলুকাসকে ৫০০ যুদ্ধের হাতী দেন। সেলুকাসকন্যার সাথে চন্দ্রগুপ্তের বিয়ে হয় বলেও মনে করা হয়।

এরপর চন্দ্রগুপ্ত দক্ষিণভারতে দিকে অগ্রসর হন। তিনি বিন্ধ্য পর্বত পেরিয়ে দাক্ষিণাত্য মালভূমির সিংহভাগ দখল করতে সক্ষম হন। এরফলে কলিঙ্গ ও দাক্ষিণাত্যের অল্পকিছু অংশ বাদে সমগ্র ভারত মৌর্য্য সাম্রাজ্যের অন্তর্গত হয়।

জৈন মতানুসারে শেষ বয়সে চন্দ্রগুপ্ত জৈন ধর্মগ্রহণ করে জৈন সন্ন্যাসী ভদ্রবাহুর সাথে দাক্ষিণাত্য যাত্রা করেন ও বর্তমানে‌ কর্ণাটকের শ্রাবণবেলগোলায় স্বেচ্ছায় উপবাসে দেহত্যাগ করেন।

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s