লিন পিয়াং সাংস্কৃতিক বিপ্লবের ক্ষেত্রে এত গুরুত্বপূর্ন কেন …

একটা কথা আমাদের মনে রাখতে হবে যে কেবল মাত্র সামরিক বাহিনীর মানুষেরা লিন পিয়াং ছাড়া সাংস্কৃতিক বিপ্লবের সূচনা করে ফেলেতে পারতেন না । কেননা প্রকৃত পক্ষে লিন পিয়াং ছিলেন বিপ্লবের প্রতীক ।

প্রতমতঃ মনে রাখবেন, মার্ক্সবাদিদের মতে রাষ্ট্র একক ভাবে একটি বিশাল সন্ত্রাসের কেন্দ্র। রাষ্ট্রই প্রকাশ্যে “সশস্ত্র বাহিনী তৈরী করে”। কেননা সেই সামরিক বাহিনির কিন্তু একটি বিপ্লবী গন চরিত্র থাকে। তবে চীনের সামরিক বাহিনীর মাঝে একটি বিচ্যুতি লক্ষ্য করা যায় ১৯৪৯ সালের পর, ক্ষমতায় অরোহনের ও বিপ্লবের পর পর ই। ইহা নিজেকে পেশাগত ভাবে আত্ম নিয়োগের দিকে মনোনিবেশ করে। তারা ক্রমে জনগণ থেকে নিজেদেরকে বিচ্ছিন্ন করতে শুরু করে। লিন পিয়াং সামরিক বাহিনীকে তাদের চলমান গতি ধারার পরিবর্তন ঘটানোর প্রায়াস পান। তিনি পুনঃ সামরিক বাহিনীকে একটি বিপ্লবী বাহিনীতে রূপান্তর করেন। তিনি সামরিক বাহিনীকে তার মূলের দিকে দাবিত করেন, তাকে গন-বাহিনীতে পরিণত করেন। তিনি রাজনীতিকে পেশা, প্রকৌশল বা সামরিক আচার হিসাবে নয় বরং গন মানুষের স্বাভাবিক জীবনের সাথে সম্পৃক্ত করে দেন। তিনি সামরিক বাহিনীকে বিপ্লবী রাজনীতি ও গনমানুষের সাথে সম্পৃক্ত করেন। পদের গৌরব বিদূরীত করেন। সামরিক বাহিনী রাজনীতি নিয়ে পড়া শোনা শুরু করে এবং জনগণের সাথে কাজ করতে আরম্ভ করে দেয়। সামরিক বাহিনী সাংস্কৃতিক কর্মে জড়িত হন। অফিসাররা সকলের সাথে মিশে কাজ কর্ম করতে থাকেন। সামরিক বাহিনী জনসাধারনের সাথে মিশে অর্থনৈতিক কাজ কর্মে জড়িত হন। লিন পিয়াং সামরিক বাহিনীকে “ইয়ানের চেতনার” সাথে যুক্ত করেন। গেড়িলা কর্মের চেতনা ও জন সেবায় সামরিক বাহিনী ব্যাপক ভাবে অংশ গ্রহন করেন।

দ্বিতিয়তঃ লিন পিয়াং পার্টির ভেতরে সাংস্কৃতিক বিপ্লবের একটি ভিত্তি তৈরী করেন। সেখানে সংশোধন পন্থার লোকেদের প্রভাবের কারনে প্রকৃত মাওবাদিদের ক্ষমতা কমতে শুরু করেছিলো। পার্টির ভেতর আদর্শহীন লোকেরা মাওসেতুং কে এক জন আধ্মাতিক নেতা বানিয়ে নিজেদের ইচ্ছে মত সব কিছু করতে চাইছিলেন। সংশোধন পন্থীদের এটা ছিলো একটি চক্রান্ত। সেই সময়ে মাওবাদিরা আদর্শের বিষয়ে নিয়ন্ত্রন করলে ও সংশোধনবাদিরা রাষ্ট্রের অন্যান্য বিষয়ে ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করে রেখেছিলো। সেই মাও বলছিলেন আমাকে বুদ্বের মাটি দিয়েই তৈরী করা হয়েছে তবে তাঁর মত কোন ক্ষমতা আমার নেই। মাও সেই পরিস্থিতি পরিবর্তনের জন্য ১৯৬০ সালে চেষ্টা করেছিলেন। মাও সেই সময়ে সমাজতান্ত্রিক শিক্ষা আন্দোলনের সূচনা করেন। তিনি মাওবাদের চেতনাকে প্রসারনের চেষ্টা করলেও সংশোধন পন্থী আমলাদের কারনে তা আর তেমন ভাবে এগোতে পারে নাই।

মহা উলম্ফনের সময়ে চীনের মানুষে একজন প্রকৃত মাওবাদি নেতা পেয়েছিলেন, আর তিনি হলেন লিন পিয়াং। তিনি একদিকে ছিলেন চীনের প্রতি রক্ষা মন্ত্রী অন্যদিকে ছিলেন সেনাবাহিনীর প্রধান। সেই কারনে তিনি সেনা বাহিনীকে মাওবাদি শিক্ষায় শিক্ষিত করে গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন। মাওবাদিদের শ্লোগান ছিলো “রাজনীতিকে কমান্ডে রাখুন”! ইহা ও লিন পিয়াংয়ের নিকট থেকেই এসেছে। তিনি ই “ক্ষুদ্র লাল বই” প্রকাশের উদ্যোগ নেন যেন সকলেই মাওবাদের আসল শিক্ষার সাথে পরিচিত হতে পারেন। লিন পিয়াং কেন্দ্রীয় ভাবে সামরিক বাহিনীকে একটি অনুগত্য শীল বাহনীতে পরিণত করতে চেষ্টা করেন। তাই যখন পার্টি মাওবাদীদের উদ্যোগের বিরোধিতা করেন তখন আমলারা বিকল্প পথে কাজ করতে থাকে। সত্যিকার অর্থে সামরিক বাহিনী দ্বৈত ক্ষমতা কাঠামো তত্ত্ব নিয়ে কাজ করেন। সাংস্কৃতিক বিপ্লবের সময়ে আসলে সেই কাজটি ই করা হচ্ছিলো। পুরাতন শক্তির বদলে নতুন শক্তির উত্থান করা। মাওসেতুং এর স্ত্রী জিয়াং কিং যিনি চার খলিফার একজন। তিনি সাংস্কৃতিক বিপ্লবে ব্যাপক ভূমিকা পালন করেন। তিনি তাঁর রাজনীতি শুরুই করেছিলেন সামরিক বাহিনীর এখন উপদেষ্টা হিসাবে, এই পদবী টা ও লিন পিয়াং তাকে “প্রদান” করেছিলেন।

তৃতীয়তঃ ১৯৬৬ সাল থেকে ১৯৬৮ সালে যে আন্দোলন চলছিলো সেই সময়ে লিন পিয়াংয়ের সামরিক বাহিনী তাঁর সূরক্ষার জন্য ব্যাপক ভূমিকা পালন করে। সামরিক বাহিনী মাওবাদিদের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করে সহযোদ্বার ভূমিকা নেয় । লিনের বাহিনী সাংস্কৃতিক বিপ্লবকে সূরক্ষা দেয় লাল ফৌজের মত। ফলে জেকবিয়ান আন্দোলনের মত মাওবাদিরা ও কাজ করার চমৎকার সুযোগ পায়। ইহা সাধারন মানুষকে সংগঠিত করার সুযোগ তৈরী করে এবং সংশোধন পন্থীদেরকে আক্রমন করার মওকা তৈরী করে দেয়। সেই সময় ঘটনা চক্রে পরস্পরের মাঝে সংঘাত অনিবার্য হয়ে উঠলে মাওসেতুং তা বন্দ্ব করতে বলেন। মাও গন আন্দোলনের সমালোচনা শুরু করেন। মাও বললেন আমি চাই শ্রেনী সংগ্রাম, কিন্তু গৃহ যুদ্ব নয়। তাই মাওসেতুং ১৯৬৭ সাল থেকে ১৯৬৮ সাল সময়ে গন আন্দোলন বন্দ্ব করে দেন। তবে, এটা চিন্তা করা ও কঠিন যে সামরিক বাহিনীর তত্ত্বাবধায়নে সাংস্কৃতিক বিপ্লবকে এগিয়ে কত কঠিন ছিলো। যদি সেই সময়ে কিছু সুর চিৎকার, রাজনৈতিক ডামাডোল চলছিলো, এবং চার খলিফার আমলে ও সত্যিকার সাংস্কৃতিক বিপ্লবের কাজ হচ্ছিলো। তবে তাদের মাঝেও দূর্বলতা ছিলো, তাদের পিছনে প্রশাসনিক সমর্থন ছিলো ক্ষীণ। এবং ১৯৭১ সালের পর থেকে তারা আর সামরিক বাহিনীর সমর্থন ও পাচ্ছিলেন না । কেননা ইতি মধ্যেই লিন পিয়াঙ্গকে সড়িয়ে সংশোধনবাদি চক্র ক্ষমতায় বসে পড়েছেন। তিনি পদ চ্যুত হয়েছিলেন মাওবাদ বিরোধী ও জনতার শত্রুদের দ্বারা। তাঁর পর ই দখলদার চক্র ক্ষমতা গ্রহন করেন।

চতুর্থতঃ লিন পিয়াং সত্যিকার ভাবে একটি ভালো বিপ্লবী অর্থনৈতিক নীতিমালা প্রনয়নের চেষ্টা করেছিলেন। গন বিপ্লবের পর, তিনি সামরিক বাহিনীর সহায়তায় মাওবাদ ভিত্তিক একটি যৌথ পরিকল্পিত অর্থনৈতিক নীতি বাস্তবায়নে উদ্যোগ নিলেন। এটা ছিলো মাওবাদ ২.০ বা উল্লম্ফন ২.০ যাকে বলা হয় “ উড়ন্ত উত্থান” । ইহা ছিলো মাওবাদি অর্থনীতির সফল একটি নমুনা । তবে মাওবাদের মৌল ভিত্তির চেয়ে এর মাঝে কিছু পার্থক্য ছিলো। তবে তা মাওবাদের বিরুদ্বে ছিলো না । কিন্তু দূর্ভাগ্য বসত, মাও ক্রমে ডান পন্থার দিকে ঝুঁকে পড়তে থাকেন। সম্ভবত মাও মহা উলম্ফনের ত্রুটি সমূহের দিকে পুনঃ ফিরে আসতে ভয় পাচ্ছিলেন। সেই সময় মাও ও বয়সের ভারে নুয়ে পড়ে ছিলেন। তিনি তারা স্বীয় লাইন থেকে সড়ে আসতে লাগলেন।
সর্ব শেষ, লিন পিয়াং সারা দুনিয়া জোড়ে গন সংগ্রামের সূচনা করতে চেয়েছিলেন। লিন পিয়াংয়ের অনুসারীরা ও এমন একটি রাজনৈতিক নীতি গ্রহন করতে চেয়েছিলেন যার কথা ছিলো বিপ্লবী অগ্রনী বাহিনী সর্বত্র গড়ে তোলা। তারা সর্বহারাদের জন্য কাজ করবেন, দুনিয়া ব্যাপী জন যুদ্বের সূচনা করবেন, কেবল চিনের সংকির্ণ স্বার্থ নয় বরং দুনিয়ার সর্বহারার স্বার্থে কাজ করতে থাকবেন। সৌভিয়েতরা আন্তর্জাতিকতার পথ ছেড়ে দিয়েছেন, জন যুদ্বের পথ ছেড়ে দিয়েছেন। এই পদক্ষেপ গুলোকে মাওবাদিরা প্রথমিক ভাবে প্রচণ্ড রকমে সমালোচনা করেছিলেন। লিন পিয়াং হলেন সেই ব্যাক্তি যিনি রাজনীতিতে গন যুদ্বের তত্ত্বকে কমিউনিস্টদের অন্তরে স্থাপন করেন। তারা বুঝতে সক্ষম হয়েছিলেন যে, সংশোধনবাদের বিপরীত ধারা হলো গন যুদ্বের পথ। ১৯৬৯ সালের নবম কংগ্রেসে লিন পিয়াং বলেছিলেন, “ বিপ্লবই হলো আসল প্রবণতা”। তারা সেই দিন বুঝতে পেড়েছিলেন যে, সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্বে ইউরূপ ও রাশিয়ান সাম্রাজ্যবাদের বিপরীতে গন সংগ্রামের বিকল্প নেই। তবে এটা কিন্তু চে র সেই “ দুই, তিন ও অনেক ভেয়েতনাম” সৃজনের পথ নয়। এই তত্ত্বের মূল কথা ছিলো, বিশ্ব পল্লীর বিপরীতে বিশ্ব নগরকে মোখোমুখি করা । বা এশিয়া, আফ্রিকা ও ল্যাতিন আমেরিকার কে সাম্রাজ্যবাদের বিপরীতে দাড় করিয়ে দেয়া। এই ভাবে লিন পিয়াং রাজনীতিকে একটি ভিন্ন মাত্রা দিয়ে ছিলেন। একটি আন্তর্জাতিক চরিত্র দান করেছিলেন। কিন্তু ১৯৭০ সালে মাওসেতুং নিজেই দেশীয় চরম পন্থার অনুসারী হয়ে আন্তর্জাতিক নীতি মালা থেকে সড়ে আসেন। তিনি সামগ্রীক ভাবে স্বদেশ মূখি নীতি গ্রহন করেন আর আন্তর্জাতিক নীতি বাদ দেন। ডান পন্থার রাজনীতি হয়ে উঠে তাঁর একটি বড় উপাদান। ১৯৭১ সালে নিল পিয়াং কে হত্যা করা হয়। মাওসেতুং কার্যত ডান পন্থী ও সংশোধনবাদীদের কবলে নিপতিত হয়ে পড়েন। তিনি সর্বহারা স্বার্থের পরিবর্তে জাতিয় স্বার্থের প্রতি বেশী গুরুত্ব আরোপ করেন। তাঁর নীতি হয়ে উঠে “ সকলের সাথে শান্তিপূর্ন” এমন কি সাম্রাজ্যবাদের সাথে ও শান্তি পূর্ন ভাবে বসবাস করা । তারা বললেন যে, সাম্রাজ্যবাদের সাথে সহন শীল নিটি গ্রহন করুন। “শান্তি পূর্ন সহাবস্থান” এক সময় সৌভিয়েতের এই নীতির তিব্র সমালোচক ছিলেন মাওসেতুং। আর এখন তিনি ও তাঁর চীন সেই নীতিই গ্রহন করলেন। তাঁর সেই লাইনকে বলা হয়েছিলো “মাওয়ের তৃতীয় বিশ্ব তত্ত্ব”, তা কিন্তু কোন ভাবে “তৃতিয় বিশ্ববাদ” নয়।… পরে আরো বলব… তুষার মির্জা .

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s