সিন্ধু সভ্যতা…

সিন্ধু সভ্যতা ছিল একটি ব্রোঞ্জ যুগীয় সভ্যতা (৩৩০০ – ১৩০০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দ; পূর্ণবর্ধিত কাল ২৬০০ – ১৯০০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দ)। এই সভ্যতার কেন্দ্র ছিল মূলত ভারতীয় উপমহাদেশের[১] পশ্চিমাঞ্চলে[২][৩] অবস্থিত সিন্ধু নদ অববাহিকা।[n ১] প্রথম দিকে এই সভ্যতা পাঞ্জাব অঞ্চলের সিন্ধু অববাহিকায় বিকাশ লাভ করে। পরে তা প্রসারিত হয় ঘগ্গর-ভাকরা নদী উপত্যকা[৭] ও গঙ্গা-যমুনা দোয়াব অঞ্চল পর্যন্ত।[৮][৯] বর্তমান পাকিস্তান রাষ্ট্রের প্রায় সম্পূর্ণ অংশ, ভারতীয় প্রজাতন্ত্রের পশ্চিমদিকের রাজ্যগুলি, দক্ষিণ-পূর্ব আফগানিস্তান এবং ইরানের বালোচিস্তান প্রদেশের পূর্ব অংশ এই সভ্যতার অন্তর্গত ছিল।

পূর্ণবর্ধিত সময়কালে এই সভ্যতা হরপ্পা সভ্যতা নামে পরিচিত। হরপ্পা ছিল এই সভ্যতার প্রথম আবিষ্কৃত শহরগুলির অন্যতম। ১৯২০-এর দশকে তদনীন্তন ব্রিটিশ ভারতের পাঞ্জাব প্রদেশে প্রত্নতাত্ত্বিক খননকার্যের ফলে এই শহরটি আবিষ্কৃত হয়।[১০] ১৯২০ সাল থেকে সিন্ধু সভ্যতার প্রত্নস্থলগুলিতে খননকার্য চলছে। ১৯৯৯ সালেও এই সভ্যতার বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রত্নসামগ্রী ও আবিষ্কৃত হয়েছে।[১১] ইউনেস্কো বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থান মহেঞ্জোদাড়ো সিন্ধু সভ্যতার একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র।

হরপ্পা ভাষা প্রত্যক্ষভাবে প্রমাণিত হয়নি এবং এই ভাষার উৎস অজ্ঞাত। যদিও ইরাবতম মহাদেবন, অস্কো পারপোলা, এফ জি বি কুইপার ও মাইকেল উইটজেল প্রমুখ বিশেষজ্ঞেরা এই ভাষার সঙ্গে প্রোটো-দ্রাবিড়ীয়, এলামো-দ্রাবিড়ীয় বা প্যারা-মুন্ডা সম্পর্কের কথা উল্লেখ করেছেন।

আবিষ্কার ও খননকার্য

১৮৪২ সালে চার্লস ম্যাসন তাঁর ন্যারেটিভস অফ ভেরিয়াস জার্নিস ইন বালোচিস্তান, আফগানিস্তান অ্যান্ড দ্য পাঞ্জাব গ্রন্থের হরপ্পার ধ্বংসাবশেষের কথা প্রথম উল্লেখ করেন। স্থানীয় অধিবাসীরা তাঁকে “তেরো ক্রোশ” দূরে একটি প্রাচীন নগরীর উপস্থিতির কথা বলেছিল। কিন্তু প্রায় শতাব্দীকাল এই বিষয়ে কেউ কোনো প্রকার প্রত্নতাত্ত্বিক আগ্রহ দেখাননি।[১২]

১৮৫৬ সালে ব্রিটিশ ইঞ্জিনিয়ার জন ও উইলিয়াম ব্রান্টন করাচি ও লাহোরের মধ্যে ইস্ট ইন্ডিয়ান রেলওয়ে কোম্পানি লাইন স্থাপনের দায়িত্ব পান। জন লিখেছেন: “রেললাইন স্থাপনের জন্য উপযুক্ত ব্যালাস্ট কোথা থেকে পাওয়া যায়, সেই ভেবে আমি খুবই চিন্তিত ছিলাম।” তাঁদের বলা হয় যে, লাইনের নিকট ব্রাহ্মণাবাদ নামে এক প্রাচীন নগরীর ধ্বংসাবশেষ রয়েছে। সেই শহরে এসে তাঁরা শক্ত ও ভালভাবে পোড়ানো ইঁটের সন্ধান পান এবং নিশ্চিত এই ভেবে যে “ব্যালাস্টের একটি উপযুক্ত উৎস পাওয়া গেছে।” ব্রাহ্মণাবাদ শহর এই ভাবে ব্যালাস্টে পরিণত হয়।[১৩] কয়েক মাস পরে, আরও উত্তরে জনের ভাই উইলিয়াম ব্রান্টনের কর্মস্থলে “লাইনের অংশে অপর একটি শহরের ধ্বংসাবশেষ দেখা যায়। এই ধ্বংসাবশেষের ইঁট নিকটবর্তী হরপ্পা গ্রামের অধিবাসীরাও ব্যবহার করত। এই ইঁটেরই ব্যালাস্টে তৈরি হয় লাহোর থেকে করাচি পর্যন্ত ৯৩ মাইল (১৫০ কিলোমিটার) দৈর্ঘ্যের রেলপথ।”[১৩]
মহেঞ্জোদাড়োয় খননকার্যের ফলে আবিষ্কৃত প্রত্নস্থল, সম্মুখে মহাস্নানাগার।

১৮৭২-৭৫ সালে আলেকজান্ডার কানিংহাম প্রথম হরপ্পা সিলমোহর প্রকাশ করেন। তিনি ভুলবশত এটি ব্রাহ্মী লিপি মনে করেছিলেন।[১৪] এর প্রায় অর্ধশতাব্দী পরে ১৯১২ সালে জে. ফ্লিট আরও কতকগুলি হরপ্পা সিলমোহর আবিষ্কার করেন। এই সিলমোহর দেখে উদ্বুদ্ধ হয়ে ১৯২১-২২ সালে স্যার জন মার্শাল এই অঞ্চলে প্রত্নতাত্ত্বিক খননকার্য অভিযান চালান। এই অভিযানের ফলস্রুতিতেই স্যার জন মার্শাল, রায়বাহাদুর দয়ারাম সাহানি ও মাধোস্বরূপ ভাট হরপ্পা এবং রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায়, ই. জে. এইচ. ম্যাককি ও স্যার জন মার্শাল মহেঞ্জোদাড়ো আবিষ্কার করেন। ১৯৩১ সালের মধ্যেই মহেঞ্জোদাড়োর অধিকাংশ প্রত্নস্থল আবিষ্কৃত হয়ে গিয়েছিল। তৎসত্ত্বেও খননকার্য অব্যাহত থাকে। এরপর ১৯৪৪ সালে ভারতীয় পুরাতাত্ত্বিক সর্বেক্ষণের তদনীন্তন ডিরেক্টর স্যার মর্টিমার হুইলারের নেতৃত্বে অপর একটি দল এই অঞ্চলে খননকার্য চালায়। ১৯৪৭ সালের পূর্বে আহমদ হাসান দানি, ব্রিজবাসী লাল, ননীগোপাল মজুমদার, স্যার মার্ক অরেল স্টেইন প্রমুখ এই অঞ্চলে খননকার্যে অংশ নিয়েছিলেন।

ভারত বিভাগের পর সিন্ধু সভ্যতার অধিকাংশ প্রত্নস্থল পাকিস্তান রাষ্ট্রের অন্তর্গত হয়। উল্লেখ্য, পাকিস্তান ভূখণ্ডই ছিল এই প্রাচীন সভ্যতার মূল কেন্দ্র। ১৯৪৯ সালে পাকিস্তান সরকারের পুরাতাত্ত্বিক উপদেষ্টা স্যার মর্টিমার হুইলার এই সব অঞ্চলে খননকার্য চালান। সিন্ধু সভ্যতার সীমান্তবর্তী প্রত্নস্থলগুলি আবিষ্কৃত হয়েছে পশ্চিমে বালোচিস্তানের সুকতাগান ডোর এবং উত্তরে আফগানিস্তানের আমুদারিয়া বা অক্সাস নদীর তীরে শোর্তুগাই অঞ্চলে।
কালপঞ্জি
মূল নিবন্ধ: সিন্ধু সভ্যতার পর্ববিভাজন

হরপ্পা সভ্যতার পূর্ণবর্ধিত সময়কাল ২৬০০ থেকে ১৯০০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দ পর্যন্ত স্থায়ী হয়েছিল। সিন্ধু সভ্যতার পূর্বসূরি আদি হরপ্পা সভ্যতা ও উত্তরসূরি পরবর্তী হরপ্পা সভ্যতার সময়কাল মিলিয়ে এই সভ্যতার পূর্ণ বিস্তারকাল খ্রিষ্টপূর্ব তেত্রিশ শতাব্দী থেকে খ্রিষ্টপূর্ব চতুর্দশ শতাব্দীর মধ্যবর্তী সময়। সিন্ধু সভ্যতার পর্ববিভাজনের ক্ষেত্রে যে দুটি শব্দ ব্যবহৃত হয় সেগুলি হল পর্ব ও যুগ।[১৫][১৬] আদি হরপ্পা সভ্যতা, পূর্ণবর্ধিত হরপ্পা সভ্যতা ও পরবর্তী হরপ্পা সভ্যতাকে যথাক্রমে আঞ্চলিকীকরণ, সংহতি ও স্থানীয়ভবন যুগও বলা হয়ে থাকে। আঞ্চলিকীকরণ যুগের সূচনা নিওলিথিক মেহেরগড় ২ সময়কাল থেকে। ইসলামাবাদের কায়েদ-এ-আজম বিশ্ববিদ্যালয়ের আহমদ হাসান দানির মতে, “মেহেরগড়ের আবিষ্কার সিন্ধু সভ্যতা সংক্রান্ত সম্পূর্ণ ধারণাটিই পরিবর্তিত করেছে। এর ফলে আমরা একেবারে গ্রামীন জীবনযাপনের সূচনালগ্ন থেকে সমগ্র সভ্যতাটির একটি পূর্ণ চিত্র প্রাপ্ত হয়েছি।”[১৭]

আনুমানিক তারিখ পর্ব যুগ
৭০০০ – ৫০০০ খ্রি.পূ. মেহেরগড় এক (অ্যাসেরামিক নিওলিথিক) আদি খাদ্য উৎপাদন যুগ
৫৫০০ – ৩৩০০ খ্রি.পূ. মেহেরগড় দুই – ছয় (সেরামিক নিওলিথিক) আঞ্চলিকীকরণ যুগ
৫৫০০ – ২৬০০ খ্রি.পূ.
৩৩০০ – ২৬০০ খ্রি.পূ. আদি হরপ্পা
৩৩০০ – ২৮০০ খ্রি.পূ. হরপ্পা ১ (ইরাবতী পর্ব)
২৮০০ – ২৬০০ খ্রি.পূ. হরপ্পা ২ (কোট দিজি পর্ব, নৌশারো এক, মেহেরগড় সাত)
২৬০০ – ১৯০০ খ্রি.পূ. পূর্ণবর্ধিত হরপ্পা (সিন্ধু সভ্যতা) সংহতি যুগ
২৬০০ – ২৪৫০ খ্রি.পূ. হরপ্পা ৩-ক (নৌশারো দুই)
২৪৫০ – ২২০০ খ্রি.পূ. হরপ্পা ৩-খ
২২০০ – ১৯০০ খ্রি.পূ. হরপ্পা ৩-গ
১৯০০ – ১৩০০ খ্রি.পূ. পরবর্তী হরপ্পা (সমাধিক্ষেত্র ঝ); হলদে-বাদামি রঙের মৃৎশিল্প স্থানীয়ভবন যুগ
১৯০০ – ১৭০০ খ্রি.পূ. হরপ্পা ৪
১৭০০ – ১৩০০ খ্রি.পূ. হরপ্পা ৫
১৩০০ – ৩০০ চিত্রিত ধূসর বস্তু, উত্তরাঞ্চলীয় কালো পালিশকৃত বস্তু (লৌহযুগ) সিন্ধু-গাঙ্গেয় সভ্যতা
ভূগোল
সিন্ধু সভ্যতার বিস্তার ও প্রধান কেন্দ্রসমূহ (রাপুর, বালাকোট, শোর্তুঘাই, মান্ডার নবআবিষ্কৃত স্থানগুলি বাদে)। বিস্তারিত মানচিত্রের জন্য দেখুন [১]।

সিন্ধু সভ্যতার বিস্তার ছিল বেলুচিস্তান থেকে সিন্ধু প্রদেশ পর্যন্ত প্রায় সমগ্র পাকিস্তান, আধুনিক ভারতের গুজরাত, রাজস্থান, হরিয়ানা ও পাঞ্জাব রাজ্য। উত্তরে এই সভ্যতা উচ্চ শতদ্রু অববাহিকার রুপার পর্যন্ত প্রসারিত ছিল। সিন্ধু সভ্যতার উদ্ভব মিশর ও পেরুর প্রাচীন সভ্যতার মতো উচ্চভূমি, মরুভূমি ও সমুদ্রবেষ্টিত উর্বর কৃষিজমিতে হয়েছিল। সাম্প্রতিক কালে পাকিস্তানের উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশেও সিন্ধু সভ্যতার নিদর্শন আবিষ্কৃত হয়েছে। আফগানিস্তানেও সিন্ধু সভ্যতার কয়েকটি উপনিবেশের সন্ধান পাওয়া গেছে। এই সভ্যতার কয়েকটি বিচ্ছিন্ন উপনিবেশের সন্ধান পাওয়া গেছে তুর্কমেনিস্তান ও গুজরাতেও। পশ্চিম বেলুচিস্তানের সুকতাগান ডোর [১৮] ও গুজরাতের লোথাল [১৯] ছিল এই সভ্যতার উপকূলীয় বসতি অঞ্চল। উত্তর আফগানিস্তানের শোর্তুঘাইতে অক্সাস নদীর ধারে,[২০] উত্তর-পশ্চিম পাকিস্তানে গোমাল নদী উপত্যকায়,[২১] ভারতের জম্মুর কাছে বিপাশা নদীর তীরে মান্ডাতে[২২] এবং দিল্লি থেকে ২৮ কিলোমিটার দূরে হিন্দোন নদীর তীরে আলমগিরপুরেও সিন্ধু সভ্যতার নিদর্শন আবিষ্কৃত হয়েছে।[২৩] সিন্ধু সভ্যতার প্রধান কেন্দ্রগুলি নদীতীরে আবিষ্কৃত হলেও, বালাকোটের মতো প্রাচীন সমুদ্র সৈকতেও কতকগুলি কেন্দ্র আবিষ্কৃত হয়েছে।[২৪] যেমন, বালাকোট।[২৫] আবার দ্বীপেও এই সভ্যতার প্রাচীন কেন্দ্র আবিষ্কৃত হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, ধোলাবীরার নাম করা যায়।[২৬]

পাকিস্তানে হাকরা প্রণালী এবং ভারতের মরশুমি নদী ঘগ্গরের পরস্পর-প্রাবৃত প্রাচীন শুষ্ক নদীখাতের প্রমাণ পাওয়া যায়। সিন্ধু সভ্যতার অনেক কেন্দ্র ঘগ্গর-হাকরা নদী অববাহিকায় গড়ে উঠেছিল।[৭] এগুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য রুপার, রাখিগড়ি, সোথি, কালিবঙ্গান ও গনওয়ারিওয়ালা।[২৭] জে. জি. স্যাফার ও ডি. এ. লিচেনস্টাইনের মতে,[২৮] হরপ্পা সভ্যতা হল “ভারত-পাকিস্তান সীমান্তের ঘগ্গর-হাকরা উপত্যকার বাগোর, হাকরা ও কোটি ডিজ সম্প্রদায় বা ‘জাতিগোষ্ঠী’ সংমিশ্রণ।”[৭]

কোনো কোনো পুরাতাত্ত্বিকের মতে, ঘগ্গর-হাকরা নদী ও তার উপনদীগুলির শুষ্ক খাতগুলির ধারে এই সভ্যতার ৫০০টিরও বেশি কেন্দ্র আবিষ্কৃত হয়েছে;[২৯] যেখানে সিন্ধু ও তার উপনদীগুলির তীরে আবিষ্কৃত হয়েছে মাত্র ১০০টির মতো কেন্দ্র।[৩০] এই কারণে তাঁরা এই সভ্যতাকে সিন্ধু ঘগ্গর-হাকরা সভ্যতা বা সিন্ধু-সরস্বতী সভ্যতা বলার পক্ষপাতী। তবে অন্যান্য ঐতিহাসিকগণ এই মতকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মনে করেন। তাঁদের মতে, সিন্ধু সভ্যতার বসতি ও কৃষি অঞ্চল ঘগ্গর-হাকরা মরু অঞ্চলে গড়ে ওঠেনি; এগুলির অধিকাংশই সিন্ধু অববাহিকার উর্বর অংশে অবস্থিত। দ্বিতীয়ত, ঘগ্গর-হাকরা উপত্যকায় প্রাপ্ত নিদর্শনস্থলের সংখ্যাটি অতিরঞ্জিত। তাছাড়া ঘগ্গর-হাকরা নদীটি নিজেই সিন্ধুর একটি উপনদী ছিল। তাই সিন্ধু সভ্যতার এই নতুন নামকরণ অযৌক্তিক।[৩১] “হরপ্পা সভ্যতা” নামটি বরং অধিকতর সুপ্রযোজ্য। কারণ অনেক পুরাতাত্ত্বিক এই সভ্যতার প্রথম আবিষ্কৃত কেন্দ্রটির নামে সভ্যতার নামকরণ করার পক্ষপাতী।
আদি হরপ্পা সভ্যতা
পশুপতি সিলমোহর, সিন্ধু সভ্যতা

নিকটবর্তী ইরাবতী নদীর নামে নামাঙ্কিত আদি হরপ্পা ইরাবতী পর্বের সময়কাল ৩৩০০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দ থেকে ২৮০০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দ। এটি পশ্চিমে হাকরা-ঘগ্গর নদী উপত্যকার হাকরা পর্বের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত। সিন্ধু প্রদেশের মহেঞ্জোদাড়োর নিকটবর্তী একটি স্থানের নামাঙ্কিত কোট দিজি পর্বের (২৮০০-২৬০০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দ, হরপ্পা দুই) পূর্ববর্তী পর্ব এটি। সিন্ধু লিপির প্রাচীনতম নিদর্শনটি খ্রিষ্টপূর্ব ৩০০০ অব্দের সমসাময়িক।

পাকিস্তানের রেহমান ধেরি ও আমরিতে পূর্ণবর্ধিত পর্বের প্রাচীন গ্রামীণ সংস্কৃতির নিদর্শন পাওয়া গেছে।[৩২] কোট দিজি (হরপ্পা দুই) এমন একটি যুগের প্রতিনিধি যা পূর্ণবর্ধিত যুগের আগমনবার্তা ঘোষণা করে। এই স্তরে কেন্দ্রীয় কর্তৃপক্ষের একটি প্রধান কেন্দ্র বিদ্যমান ছিল এবং নাগরিক জীবনযাত্রার মানও ক্রমশ উন্নত হচ্ছিল। এই শহরের আরও একটি শহর ভারতে হাকরা নদীর তীরে কালিবঙ্গানে পাওয়া গেছে।[৩৩]

অন্যান্য আঞ্চলিক সভ্যতার সঙ্গে এই সভ্যতার বাণিজ্যিক সম্পর্ক বিদ্যমান ছিল। লাপিস লাজুলি ও অন্যান্য রত্ন প্রস্তুতকারক উপাদান দূর থেকে আমদানি করা হত। গ্রামবাসীরা এই সময় মটর, তিল, খেজুর ও তুলার চাষ করত। এই সময় মহিষ পোষ মানানো শুরু হয়। ২৬০০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দ নাগাদ হরপ্পা বৃহৎ এক নগরকেন্দ্রে পরিণত হয়। এই সময়কাল থেকেই পূর্ণবর্ধিত হরপ্পা সভ্যতার সূচনা।
পূর্ণবর্ধিত হরপ্পা সভ্যতা

২৬০০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দ নাগাদ আদি হরপ্পা সভ্যতার অধিবাসীরা একাধিক বৃহৎ নগর কেন্দ্রে গড়ে তুলেছিল। এই ধরনের কয়েকটি উল্লেখযোগ্য নগর হল আধুনিক পাকিস্তানের হরপ্পা, গনেরিওয়ালা, মহেঞ্জোদাড়ো এবং ভারতের ধোলাবীরা, কালিবঙ্গান, রাখিগড়ি, রুপার, লোথাল ইত্যাদি। সিন্ধু ও তার উপনদীগুলির অববাহিকায় মোট ১,০৫২টি প্রাচীন নগর ও বসতি অঞ্চলের সন্ধান পাওয়া গিয়েছে।
নগর
তথাকথিত “পুরোহিত রাজ” মূর্তি, মহেঞ্জোদাড়ো, পরবর্তী পূর্ণবর্ধিত হরপ্পা যুগ, জাতীয় জাদুঘর, করাচি, পাকিস্তান

সিন্ধু সভ্যতায় এক অভিজাত ও উন্নত প্রযুক্তিসম্পন্ন নগরাঞ্চলীয় সংস্কৃতির প্রমাণ পাওয়া যায়। এই শহরগুলিই ছিল এই অঞ্চলের প্রাচীনতম নগরব্যবস্থা। নগর পরিকল্পনার উচ্চমান দেখে অনুমিত হয় নগরোন্নয়ন পরিকল্পনা সম্পর্কে এই অঞ্চলের মানুষের যথেষ্ট জ্ঞান ছিল এবং এখানে একটি দক্ষ পৌর সরকারেরও অস্তিত্ব ছিল। এই সরকারব্যবস্থায় স্বাস্থ্যসচেতনতা যেমন গুরুত্ব পেত, তেমনি নাগরিকদের ধর্মীয় রীতিনীতি পালনের সুবিধা-অসুবিধার দিকেও নজর রাখা হত।

হরপ্পা, মহেঞ্জোদাড়ো এবং রাখিগড়ির যে অংশে খননকার্য চলেছে, সেই অংশের নগরোন্নয়ন পরিকল্পনার অন্তর্গত ছিল বিশ্বের প্রথম নগরাঞ্চলীয় নিকাশি ব্যবস্থা। শহরে বাড়ির মধ্যে স্বতন্ত্র কূপ থেকে জল তোলা হত; কোনো কোনো ক্ষেত্রে একাধিক বাড়ি একটি সার্বজনীন কূপ থেকেও জল নিত। স্নানের জন্য নির্দিষ্ট ঘরটি থেকে নালিপথে বর্জ্যজল ঢাকা নর্দমার দিকে পাঠানো হত। এই ঢাকা নর্দমাগুলি শহরের প্রধান প্রধান রাস্তার দুই পাশে অবস্থিত ছিল। বাড়ির দরজা থাকত আভ্যন্তরীণ অঙ্গন বা ছোটো ছোটো গলির দিকে। এই অঞ্চলের কোনো কোনো গ্রামের গৃহনির্মাণ পদ্ধতির মধ্যে আজও হরপ্পার গৃহনির্মাণ পদ্ধতির কিছু রীতি বিদ্যমান রয়েছে।[৩৪]

এই অঞ্চলের জলনিকাশি ব্যবস্থা মধ্যপ্রাচ্য, ভারত ও পাকিস্তানে আবিষ্কৃত যে কোনো প্রাচীন সভ্যতার চেয়ে অনেক উন্নত ছিল। পোতাঙ্গন, শস্যাগার, গুদাম, ইষ্টকনির্মিত অঙ্গন ও রক্ষাপ্রাচীরগুলি হরপ্পার উন্নত স্থাপত্যকলার পরিচায়ক।

এই অঞ্চলে দুর্গনির্মাণের প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে বিশেষজ্ঞদের মধ্যে মতান্তর রয়েছে। মেসোপটেমিয়া বা প্রাচীন মিশরের মতো এই সভ্যতায় কোনো বৃহদাকার ভবন বা স্থাপনার সন্ধান পাওয়া যায় না। প্রাসাদ বা মন্দিরেরও কোনো সন্দেহাতীত প্রমাণ নেই। প্রমাণ নেই রাজা, সেনাবাহিনী বা পুরোহিত শ্রেণীর অস্তিত্বেরও। কয়েকটি বড়ো স্থাপনাকে শস্যাগার মনে করা হয়। একটি শহরে এক সুবিশাল স্নানাগারের (মহাস্নানাগার, মহেঞ্জোদাড়ো) সন্ধান পাওয়া গিয়েছে। এটি সম্ভবত গণস্নানাগার ছিল। দুর্গগুলি প্রাচীরবেষ্টিত; তবে এই প্রাচীর প্রতিরক্ষার্থে নির্মিত হয়েছিল কিনা তাও জানা যায় না। সম্ভবত বন্যার জল প্রতিরোধের জন্যই এগুলি নির্মাণ করা হয়েছিল।

মনে করা হয়, শহরের অনেক বাসিন্দাই ছিলেন বণিক ও শিল্পী। তাঁরা নির্দিষ্ট পেশার ভিত্তিতে শহরের মধ্যে পল্লি নির্মাণ করে বাস করতেন।

সিলমোহর, পুতি ও অন্যান্য দ্রব্য নির্মাণে অন্যান্য অঞ্চল থেকে আমদানিকৃত উপাদান ব্যবহৃত হত। আবিষ্কৃত পুরাদ্রব্যগুলির মধ্যে একটি চকচকে মৃৎনির্মিত পুতি পাওয়া গিয়েছে। সিলমোহরে প্রাণী, মানুষ (সম্ভবত দেবতা) ও লিপি খোদিত থাকত। এই সিন্ধু লিপির পাঠোদ্ধার করা আজও সম্ভব হয়নি। কোনো কোনো সিলমোহর ব্যবহৃত হত পণ্যদ্রব্যের উপর মাটির ছাপ দেওয়ার জন্য। এগুলির অন্যান্য ব্যবহারও সম্ভবত ছিল।

হরপ্পা সভ্যতায় কয়েকটি বাড়ি অন্যান্য বাড়ি থেকে বড়ো আকারের ছিল। কিন্তু তা সত্ত্বেও এই সভ্যতার শহরগুলিতে সমতাবাদী বা ইগালেটারিয়ান সমাজব্যবস্থার দেখা পাওয়া যায়। সব বাড়িতেও জল ও নিকাশি সংযোগ ছিল। এর থেকে মনে হয়, এই সভ্যতায় ধনকেন্দ্রিকতার প্রবণতা কম ছিল। তবে ব্যক্তিগত গৃহসজ্জা থেকে শ্রেণীবিভক্ত সমাজব্যবস্থার পরিচয়ও পাওয়া যায়।
কৃষি ও জীবিকা

একথা অনস্বীকার্য যে, নাগরিক বিপ্লবের জন্য কৃষি উৎপাদনের পর্যাপ্ত পরিমাণ প্রসারণ প্রয়োজন। সিন্ধু উপত্যকায় কোনো বিশেষ কারণ ছিলো, যা এ ধরনের প্রসারে অভূতপূর্ব সহযোগিতা করোছিলো। বলা হয় যে, খ্রিস্টপূর্ব ৫৫১০ থেকে খ্রিস্টপূর্ব ২২৩০, এ সময়কালে আজকের তুলনায় অত্যন্ত বেশি বৃষি্টপাত হওয়ায়, সে অঞ্চলে দীর্ঘকাল আর্দ্র পর্ব স্থায়ী হয়েছিলো। পরিবেশের এ সহায়তার কারণে সিন্ধু উপত্যকায় পূর্ববর্তী এবং পরবর্তী সময়ের তুলনায় সে সময়ে অনেক বেশি পরিমাণ খাদ্যশস্য উৎপাদিত হয়েছিলো। তবে কৃষিক্ষেত্রে সিন্ধু সভ্যতায় বৈপ্লবিক পরিবর্তন ঘটায়, ওই সময়কার কৃষি হাতিয়ার। প্রাচীন সিন্ধু সংস্কৃতির সময়কালে লাঙলের উপস্থিতিই তার একমাত্র প্রমাণ নয়, বরং বানাওয়ালি এবং জাওয়াইওয়ালায় (বাহাওয়ালপুর) কাদামাটির লাঙল আবিষ্কারও একই সূত্রে গৎথা। উত্তরপূর্ব আফগানিস্তানে শোরতুঘাই এর সিন্ধু জনবসতিতে লাঙল-কর্ষিত ভূক্ষেত্র পাওয়া গেছে। লাঙল আসার পরে উৎপাদন ক্ষমতার ব্যাপক উন্নতি সাধিত হলেও, ফসল কাটার জন্য তেমন কোনো যন্ত্রপাতি সেসময়ের ইতিহাস থেকে জানা যায় না।[৩৫]

ভূপৃষ্ঠের অভ্যন্তরে সঞ্চিত ভৌমজলকে যেসব প্রাচীন সভ্যতায় কূপের সাহায্যে সংরক্ষিত করা হতো, তাদের মধ্যে প্রথম যে সভ্যতার সঙ্গে আমাদের পরিচয় হয়েছে, তা হলো সিন্ধু সভ্যতা। গ্রামেও যে কাচা ইদারা খনন করা হতো, সে বিষয়ে সন্দেহের কোনো কারণ নেই। আর আল্লাহডিনো (করাচীর নিকটে)তে উচ্চতর ভূমিতে নির্মিত এক পাথরে বাধানো কূপও রয়েছে। সম্ভবত নিচের ভূক্ষেত্রে ব্যবহারের জন্য এটি উচুতে স্থাপন করা হয়েছে। তবে সেখানে পুলি ব্যবস্থা চোখে পড়েনি।

প্রাচীন এবং পরিণত সিন্ধু এলাকাসমূহে খেজুর, বদরী (ber), আঙুর এবং আনারস উৎপাদিত হবার প্রমাণ (বীজের স্বাক্ষ্য) পাওয়া গেছে। প্রথম দুটি মেহরগড়ের প্রাচীনতম বসতিস্তরে পাওয়া গেছে। পরের দুটি হেলমন্দ উপত্যকায় উৎপাদিত হতো। আবিস্কৃত প্রাণী অস্থির মধ্যে “জেবু”র সন্তানসন্ততিদের হাড়ের সংখ্যা অত্যাধিক। বলদ গাড়ি এবং লাঙল টানতো এবং গরু দুধ দিতো, এতেই বেশ স্পষ্ট হয়ে ওঠে সিন্ধু এলাকার মানুষজনের জীবনযাত্রার স্বর্ণইতিহাস। এছাড়া সিন্ধু এলাকার জনগণের অন্যতম পেশা ছিলো শিকার। সিন্ধু সীল মোহর দেখে একটি বিষয় বলা যায় যে, বন্য এবং হিংস্র পশুর মোকাবেলা করা তখনকার সময়ের মানুষদের মধ্যে একটি অন্যতম বিষয় হিসেবে প্রতিভাত হয়।

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s