অহিংসা ….

অহিংসা একটি নৈতিকতত্ত্ব। অহিংসার উৎপত্তি প্রাচীন ভারতে; জৈনধর্মের সঙ্গে এর বিশেষ সংযুক্তি হলেও বৌদ্ধধর্মে এর অনুশীলন বেশি। সকল জীবের প্রতি অহিংসা প্রদর্শনের ধারণাটি জৈন ও বৌদ্ধ নৈতিকতার ভিত্তি তৈরি করে। জৈন ও বৌদ্ধ নৈতিকতায় সকল জীবের প্রতি করুণা ও ক্ষতি না করার বিষয়টি অনন্য এবং পশুবলির প্রাচীন বৈদিক ধর্মীয় অনুষ্ঠানের বিরুদ্ধে প্রতিবাদস্বরূপ জৈন ও বৌদ্ধ নৈতিকতার উৎপত্তি। আধুনিককালে মহাত্মা গান্ধী অহিংসার ব্যাখ্যাকার হিসেবে সর্বজন পরিচিত।

জৈন অহিংসা নীতি তাদের বিশ্বতত্ত্ব বা অধিবিদ্যার যৌক্তিক পরিণতি বলে মনে হয়। জৈন অধিবিদ্যার মূল প্রতিপাদ্য বিষয় হচ্ছে প্রতিটি জীব ও জীবনের মধ্যেই আত্মা বিরাজমান। এই বিশ্ব বিভিন্ন বস্ত্ত বা দ্রব্য দ্বারা গঠিত। সুতরাং, বিশ্বে যতো দ্রব্য আছে ঠিক তত সংখ্যক আত্মাও রয়েছে। গৌতম বুদ্ধের সমসাময়িক এভং জৈনধর্মের প্রতিষ্ঠাতা মহাবীর অহিংসার ধারণা ব্যাখ্যা করে বলেন যে, অহিংসা হচ্ছে হিংস্রতা পরিত্যাগ এবং এটি শুধু মানুষ ও মানবেতর প্রাণীর ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়, বরং তা পৃথিবী, পাথর, জল, আগুন, বাতাস ইত্যাদির ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। তাঁর মতে, এগুলোও জীবন্ত সত্তা এবং এগুলো মানুষ, উদ্ভিদ ও মানবেতর প্রাণীর মতোই বেদনা অনুভব করে।

ভারতের অন্যান্য ধর্ম ও দার্শনিক ঐতিহ্যের মতোই জৈনদর্শনের লক্ষ্য হচ্ছে দুঃখকষ্ট ভোগের দ্বারা জীবের বন্ধন থেকে মুক্তি বা মোক্ষলাভ করা। জৈন মতে, একজন ব্যক্তি বা জীব যখন বস্ত্ত (পদগুল) দ্বারা গঠিত বন্ধন মুক্ত করতে সমর্থ হয় বা জন্ম ও পুনর্জন্মের প্রক্রিয়া দ্বারা বস্ত্তগত দেহ লাভ করা থেকে বিরত থাকতে সমর্থ হয়, তখনই সেই ব্যক্তি জীবনের পরমলক্ষ্য লাভের আশা করতে পারে। ভারতের বিভিন্ন ধর্ম বা দার্শনিক সম্প্রদায়ের মতো এই মোক্ষলাভের পথ এক নয়। উদাহরণস্বরূপ, বৌদ্ধদর্শন মোক্ষলাভের জন্য অষ্টাঙ্গিক মার্গের কথা উল্লেখ করে। কিন্তু জৈনদর্শন মোক্ষলাভের জন্য তিনটি অপরিহার্য শর্তের কথা উল্লেখ করে। এগুলো হচ্ছে: সম্যক বিশ্বাস, সম্যক জ্ঞান ও সম্যকচরিত্র।

সম্যকচরিত্র পাঁচটি ব্রত (মহাব্রত) অনুশীলনের মধ্যে নিহিত: (১) অহিংসা; (২) মিথ্যা থেকে নিবৃত্ত থাকা (সত্য); (৩) চুরি করা থেকে নিবৃত্ত থাকা (আস্তেয়ম); (৪) কৌমার্য (ব্রহ্মচর্য); এবং (৫) বিষয় আসক্তি থেকে নিবৃত্ত থাকা (অপরিগ্রহ)। প্রথম ব্রতটি এরূপ: আমি সকল সূক্ষ্ম বা স্থূল, জড় বা অজড় জীবন্তসত্তা হত্যা করা পরিত্যাগ করবো। কিংবা আমি নিজে জীবন্তসত্তা হত্যা করবো না (অন্যকেও করতে দেবো না, বা হত্যা করার সম্মতিজ্ঞাপন করবো না)। আমি যতদিন বেঁচে থাকবো ততদিন এসব পাপ কাজের কথা স্বীকার করছি। এ জন্য নিজেকে দোষী সাব্যস্ত করছি। অনুশোচনা করছি। আমি মানসিক, দৈহিক এবং বাক্য- এই তিন উপায়ে এসব পাপ কাজ করা থেকে নিজেকে বিরত রাখবো। জৈন-অজৈন সকলকে সন্ন্যাসধর্ম পালন করে এই ব্রত গ্রহণ করে অত্যন্ত কঠোরভাবে তা অনুশীলন করতে হয়। প্রথম ব্রত অহিংসা পালনের জন্য কিছু কিছু জৈন রাস্তায় ঝাড় দিয়ে চলাফেরা করে যাতে কোনো প্রাণীর জীবন ধ্বংস না হয়, মসলিন কাপড় দিয়ে মুখ ঢেকে রাখে যাতে কোনো জীব গিলে না ফেলে বা নিঃশ্বাস গ্রহণের সময় নাকের ভিতর গিয়ে কোনো পোকা মাকড় বা জীবের ক্ষতি না হয়। এমন কি তারা মধু বা পরিস্রাবিত জল পান করতেও অস্বীকৃতি জানায় যাতে এর মধ্যে বিদ্যমান আত্মার ক্ষতি সাধিত না হয়।

মনে হয় জৈনদর্শনের তুলনায় বৌদ্ধদর্শনে অহিংসার ধারণা বিস্তৃতভাবে বিকাশলাভ করেছে। পৃথিবীতে জৈনদর্শনের তুলনায় বৌদ্ধদর্শনে ব্যাপক প্রসারের কারণেই অহিংসার ধারণাটি বৌদ্ধদর্শনের সঙ্গে বেশি সম্পৃক্ত। ঐতিহাসিক প্রমাণ থেকে দেখা যায় যে, প্রাচীন ও মধ্যযুগীয় ভারতে জৈনধর্ম জনপ্রিয়তা লাভ করেনি, অন্যদিকে সম্রাট অশোক, কনিষ্ক ও পাল রাজত্বের সময় বৌদ্ধধর্ম রাষ্ট্রধর্মের মর্যাদালাভ করেছে। এসব বৌদ্ধ শাসকদের সময় বৌদ্ধধর্ম রাষ্ট্রীয় নীতি হিসেবে গৃহীত হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, অশোকের সাম্রাজ্যের পশুহত্যা করা নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। জৈনধর্মের উৎপত্তি ভারতে কিন্তু ভারতের বাইরে এই ধর্ম বিস্তারলাভ করেনি। পক্ষান্তরে বৌদ্ধদর্শনের উৎপত্তি ভারতে হলেও, এই দর্শন উত্তর ভারত থেকে তিববত এবং এর প্রতিবেশি রাষ্ট্র নেপাল, সিকিম, ভুটান, চিন, জাপান, কোরিয়া, মঙ্গোলিয়া এবং দক্ষিণে শ্রীলঙ্কা, বার্মা, থাইল্যান্ড, কম্বোডিয়া, লাউস ও ভিয়েতনামসহ মালয়ের সামুদ্রিক জলবেষ্টিত উপদ্বীপসমূহে বিস্তারলাভ করেছে। এসব দেশে জৈনধর্ম অপরিচিত হওয়ার কারণে অহিংসাকে বৌদ্ধদর্শনের নীতি হিসেবে গ্রহণ করা হয়।

অন্যদিক থেকে বিবেচনা করলে দেখা যায় যে, বৌদ্ধধর্মের অহিংসার ধারণাটি জৈনধর্মের অহিংসার উন্নতরূপ। জীবন্ত সত্তাকে ক্ষতি করা থেকে বিরত থাকার ব্রত গ্রহণ একটি নেতিবাচক প্রক্রিয়া এবং সব রকম জীবন্তসত্তার প্রতি প্রেম ও সমবেদনার মতো সদর্থক নৈতিক আচরণ অনুশীলন ব্যতীত তা অসম্পূর্ণ বলে প্রতীয়মান হয়। বিষয়টি এই নয় যে, জৈন অহিংসার নীতিতে জীবন্তসত্তার প্রতি সম্মান ও সমবেদনার স্থান নেই, প্রকৃত বিষয়টি হচ্ছে জৈনধর্মে এই ইতিবাচক নৈতিক দিকটি বিকশিত হয়নি। অন্যদিকে বৌদ্ধধর্মে এই ইতিবাচক ও নেতিবাচক উভয় নৈতিকতার দিকটিই পরিপূর্ণরূপে বিকশিত হয়েছে। বৌদ্ধধর্মের শাশ্বত প্রেমের ওপর গুরুত্বারোপ অহিংসার একটি উন্নত অর্থ প্রদান করেছে। এর মধ্যে রয়েছে সকল জীবন্তসত্তার ক্ষতি করা থেকে শুধু বিরত থাকাই নয়, সকল জীবন্ত সত্তাকে ভালোবাসা।

বৌদ্ধধর্মের পাঁচটি অনুশাসনের মধ্যে একটি হচ্ছে অহিংসা যা পঞ্চশীল নামে পরিচিত। এই পঞ্চশীলই অষ্টাঙ্গিক মার্গের সম্যক কর্মের মধ্যে দিয়ে নির্বাণলাভে উপনীত করে। প্রথম জৈন মহাব্রতের মতো প্রথম অনুশাসনের ব্রতটি হচ্ছে, সকল জীবন্তসত্তার ক্ষতি করা থেকে বিরত থাকার অনুশীলন নীতি গ্রহণ। সাধারণভাবে হত্যা করা অর্থে যা বোঝায় এই অনুশাসন তার চেয়েও বেশি কিছু নির্দেশ করে। উদাহরণস্বরূপ, প্রাণহরণ করার বিভিন্ন পদ্ধতি রয়েছে: (১) ব্যক্তি নিজের তরবারি বা বর্শা দ্বারা; (২) অন্যকে আদেশ দিয়ে; (৩) বল্লম, তীর বা পাথর ছুড়ে; (৪) মাটিতে গর্ত করে, স্প্রিং-এর মতো প্রতারণাপূর্ণ যন্ত্র ব্যবহার করে বা পুকুরের জল বিষাক্ত করে; (৫) জাদুমন্ত্র অনুষ্ঠানের মাধ্যমে; (৬) অপদেবতাদের ব্যবহার করে। এখানে ধম্মপদ থেকে একটি উদ্ধৃতি দেয়া হলো: ‘দৈহিক হিংস্র আচরণে সকলেই কেঁপে ওঠে এবং সকলেই মৃত্যুকে ভয় পায়। সকলের কাছে জীবনই প্রিয়। সুতরাং নিজেকে অন্যের সঙ্গে তুলনা করে, কেউ অন্যকে আঘাত করবে না বা মৃত্যুর কারণ হবে না।’ গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি হচ্ছে বৌদ্ধধর্মে অহিংসা বলতে শুধু জীবন্ত সত্তাকে হত্যা করা বা ক্ষতি করা নয়। জীবন্তসত্তাকে ক্ষতি করার ইচ্ছাপোষণ করা বা এরূপ উদ্দেশ্য থাকা প্রাণহরণের মতোই পাপকাজ।

বৌদ্ধধর্মে শুধু অহিংসামূলক আচরণ বা অশুভ কাজ থেকে বিরত থাকার উপদেশই দেয়া হয় না, বরং চিত্তে বা হূদয়ে শুভ কাজ করার অভ্যাস গড়ে তোলার উপদেশও দেয়া হয়। বৌদ্ধ সাহিত্যে অশুভ কাজ পরিহার করার পাশাপাশি শুভ কাজ করারও একটি তালিকা প্রদান করা হয়। এরূপ শুভ কাজের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ করণীয় কাজ দান নামে পরিচিত যার আক্ষরিক অর্থ হচ্ছে অন্যকে দেয়া’। আমরা যে-কেউ যে কোনো সময় এবং যেকোনোভাবে দান নামক এই বৌদ্ধ সদগুণটি অনুশীলন করতে পারি। অবশ্য দান নামক এই সদগুণটি বস্ত্তগত অর্থে কাউকে কিছু দেয়া নয়। এটি হচ্ছে কাউকে কিছু দেয়ার বা সাহায্য করার ইচ্ছা যা বস্ত্তগত দেয়া থেকে অনেক বেশি। সুতরাং দানের প্রকৃত অর্থ হচ্ছে অন্যের উপকার করার জন্য উদ্বিগ্ন হওয়া। তাই দান নামক সদগুণের গুরুত্বপূর্ণ বৌদ্ধ ধারণাটি হচ্ছে মেত্তা যার অর্থ হচ্ছে সকল জীবন্তসত্তার প্রতি দয়া ভালোবাসা। অহিংসার অন্য একটি নাম হচ্ছে মেত্তা। সকল সত্তার প্রকৃত কল্যাণের জন্য আন্তরিক ও নিঃস্বার্থ কামনা হচ্ছে মেত্তা। মেত্তার সারসংক্ষেপ নিম্নরূপ: সকল প্রাণী সুখী হোক (সবেবর সত্তা সুখীতা হন্তু)।

যোগদর্শনে অহিংসা একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। পতঞ্জলির যোগসূত্রে অহিংসার উল্লেখ রয়েছে। যোগদর্শনে যোগের অষ্ট যোগাঙ্গ অনুশীলনের কথা বলা হয়েছে। এই অষ্ট যোগাঙ্গের একটি হচ্ছে যম যার অর্থ হচ্ছে বিরত থাকা। জৈন ও বৌদ্ধ নৈতিকতা অনুসারে একজন যোগীকে ৫টি যম পরিহার বা বর্জন অনুশীলন করতে হয়, এবং অহিংসা হচ্ছে এদের একটি।

মূলত আধ্যাত্মিক উন্নতির জন্যই অহিংসা অনুশীলন করতে হয়। আধুনিককালে মহাত্মা গান্ধী অহিংসার ধারণার মধ্যে একটি নতুন মাত্রা যুক্ত করেছেন। তিনি ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে স্বাধীনতা সংগ্রামে অহিংসাকে একটি সক্ষম ফলপ্রসূ রাজনৈতিক শক্তিতে রূপান্তর করেছেন। স্বাধীনতা আন্দোলনে যেখানে সাধারণত সহিংসতা এবং প্রচুর অস্ত্র ব্যবহূত হতো সেখানে মহাত্মা গান্ধী অহিংসাকে একটি রাজনৈতিক মতবাদ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন এবং ভারতের মাটি থেকে ব্রিটিশ শাসকদের শান্তিপূর্ণভাবে বিদায় করার গুরুত্বপূর্ণ কৌশল আবিষ্কার করে ইতিহাস সৃষ্টি করেন। গান্ধীর অহিংসায় কোনো দুর্বলতা বা ভীরুতার প্রকাশ ছিল না, ছিল সাহসী মানুষের দৃঢ় প্রত্যয়, মানসিক শক্তি ও নৈতিক শ্রেষ্ঠত্বের কৌশলের অস্ত্র। গান্ধীর অনুসারীরা ছিল ব্রিটিশ শাসকদের সহিংস পদক্ষেপের বিরুদ্ধে অহিংসায় প্রশিক্ষিত ও নৈতিকভাবে শক্তিশালী- তা সে-কাজটি যত কঠিনই হোক না কেন। গান্ধীর কৃতিত্ব এখানেই যে তাঁর অহিংস দর্শনের অনুসারীদের নিকট ব্রিটিশরা পদানত হয় এবং স্বাধীনতার জন্য কোটি কোটি ভারতবাসীর নিকট অহিংসা বাস্তবরূপ লাভ করে। সহিংসকামীদের নিকট নয়, গান্ধীর অহিংস নীতির কাছেই ব্রিটিশ সরকার ভারতের স্বাধীনতা নিয়ে আলোচনা করে। গান্ধী অহিংসাকে তাঁর নিয়ত সত্য অনুসন্ধানের অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত করেন যাকে তিনি সত্যাগ্রহ নামে অভিহিত করেন। কোনো প্রকার ব্যতিক্রম ছাড়াই সকল ভারতীয়দের নাম নিবন্ধন আইনের প্রতিবাদে তিনি প্রথম ১৯০৭ সালে দক্ষিণ আফ্রিকায় সত্যাগ্রহ আন্দোলন শুরু করেন। গান্ধীর নিকট সত্যই ধর্ম এবং অহিংসার পথ ব্যতীত আর কোনো উপায়ে সত্যলাভ সম্ভব নয়। সুতরাং সত্যাগ্রহ সক্রিয় অহিংসা মতবাদ নামে পরিচিত। গান্ধীর মতে, একটি সত্যনিষ্ঠ কাজে একজন ব্যক্তি নিজে আঘাত পাওয়ার জন্য প্রস্ত্তত থাকবে। কিন্তু সে অন্যকে আঘাত করবে না- এটি হচ্ছে অহিংস মতবাদ দ্বারা নিয়ন্ত্রিত একটি কাজ। [নীরুকুমার চাকমা]

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s