আইনেও বৈষম্যের শিকার চা–শ্রমিকেরা…

মৌলভীবাজার জেলার শ্রীমঙ্গলের কালীঘাট ইউনিয়নে লোকসংখ্যা প্রায় ২৪ হাজার। এখানে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় সাতটি। উপজেলার মির্জাপুর ইউনিয়নের লোকসংখ্যা ২৯ হাজার, প্রাথমিক বিদ্যালয় ১৮টি। কালীঘাটে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলো তৈরি হয় ২০১৩ সালে।
২০১১ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী, বাংলাদেশের চায়ের রাজধানী খ্যাত শ্রীমঙ্গলে সাক্ষরতার হার ৪৮ দশমিক ৩ শতাংশ। উপজেলায় সর্বনিম্ন হার রাজঘাট ইউনিয়নে, ৩৩ দশমিক ৮। এরপর আছে কালীঘাটে ৩৪ দশমিক ৭ ও সাতগাঁওয়ে ৪০ দশমিক ১ শতাংশ। এই তিন ইউনিয়নে শিক্ষার হার কম কেন—জানতে চাইলে উপজেলা সহকারী শিক্ষা কর্মকর্তা সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘এই তিন ইউনিয়নে চা-শ্রমিকের সংখ্যা বেশি। শিক্ষার হার কম হওয়ার এটাই কারণ।’
কেবল শিক্ষা নয়; সিলেট, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ এবং চট্টগ্রামের চা-বাগানগুলোতে বাস করা শ্রমিকেরা সামাজিক নানা খাতে পিছিয়ে। চা-শ্রমিক সংগঠন এবং শ্রম আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, চা-শ্রমিকেরা শ্রম আইনেও বৈষম্যের শিকার।
এই চার জেলায় ২৪০টি বাগানে শ্রমিক আছেন ১ লাখ ৩০ হাজার এবং তাঁদের পরিবারের সদস্যসংখ্যা ছয় লাখের বেশি।
জাতিসংঘ শিশু তহবিলের (ইউনিসেফ) সহযোগিতায় বেসরকারি সংস্থা হিউম্যান ডেভেলপমেন্ট রিসার্চ সেন্টারের (এইচডিআরসি) ২০১০ সালে প্রকাশিত এক গবেষণায় দেখা যায়, চা-বাগানের ৭৪ শতাংশ পরিবার দারিদ্র্যসীমার নিচে অবস্থান করে। জাতীয় পর্যায়ে এই হার ৩৮ দশমিক ৪ শতাংশ। ৬ থেকে ১০ বছর বয়সী শিশুদের মধ্যে চা-বাগানের ৬২ শতাংশ বিদ্যালয়ে যায়। জাতীয় পর্যায়ে তা ৮১ শতাংশ।
অর্থনীতিবিদ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টারের নির্বাহী চেয়ারম্যান হোসেন জিল্লুর রহমান গতকাল বৃহস্পতিবার প্রথম আলোকে বলেন, ‘দেশের মূল জনগোষ্ঠীর দরিদ্ররা প্রান্তিকতার প্রাচীর ভেঙে ফেললেও চা-জনগোষ্ঠীর মানুষদের প্রান্তিকতার বাড়তি বোঝা বহন করতে হয়।’ তিনি বলেন, চা-বাগানের মানুষের জীবনমানের উন্নয়নের জন্য সরকারি স্তরে বিশেষ কোনো কর্মসূচি নেই। তাঁদের উন্নতির জন্য যেমন সরকারের, তেমনি মালিকদেরও সক্রিয় হতে হবে।
চা-বাগান মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশীয় চা সংসদের (বিটিএ) সচিব কাজী মোজাফফর আহমেদ প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমি চা সংসদে নতুন এসেছি।’
বাংলাদেশের একক বৃহত্তম ট্রেড ইউনিয়ন বাংলাদেশ চা-শ্রমিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক রামভজন কৈরী বলেন, ‘মালিকদের সঙ্গে প্রতি দুই বছর পর শ্রমিকদের চুক্তি নবায়নের নিয়ম থাকলেও ২০০৯ সাল থেকে এই প্রক্রিয়া বন্ধ আছে। গত ফেব্রুয়ারি থেকে মালিকদের সঙ্গে আলোচনা শুরু হলেও মালিকপক্ষ অযথা বিলম্ব করছে।’
এ বিষয়ে বিটিএর সচিব বলেন, ‘বিলম্বের অভিযোগ সত্য নয়।’
আইনে বৈষম্য: ২০০৬ সালের শ্রম আইনের ৩২ ধারা অনুযায়ী, কোনো চা-শ্রমিক চাকরি হারালে তাঁকে ৬০ দিনের মধ্যে মালিকের বরাদ্দ দেওয়া বাসস্থান ছাড়তে হবে। জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান মিজানুর রহমান বলেন, ‘একজন শ্রমিক যাতে অবশ্যই শ্রমিক থেকে যায়, সে জন্যই বাসস্থান-সংক্রান্ত শ্রম আইনের এই ধারা তৈরি করা হয়েছে।’
চা-বাগানে স্থায়ী ও অস্থায়ী—এই দুই ধরনের শ্রমিক থাকেন। শ্রম আইন অনুযায়ী ৯০ দিনের মধ্যে শ্রমিকদের চাকরি স্থায়ী করার কথা। তবে রামভজন কৈরী বলেন, বাগানে ১ থেকে ১০ বছর ধরে কাজ করা ৩০ হাজার অস্থায়ী শ্রমিক আছেন। তাঁদের স্থায়ী করতে মালিকদের কাছে দাবি জানানো হয়েছে।
শ্রম আইনের ১১৭ ধারায় কারখানা, শিল্পপ্রতিষ্ঠান, সড়ক পরিবহন শ্রমিকদের ক্ষেত্রে প্রতি ১৮ দিন কাজের জন্য এক দিন এবং সংবাদপত্র শ্রমিকের জন্য প্রতি ১১ দিন কাজের জন্য এক দিন অর্জিত ছুটির বিধান আছে। অথচ এই আইনে চা-বাগানের শ্রমিকের প্রতি ২২ দিন কাজের জন্য অর্জিত ছুটি এক দিন। চা-শ্রমিকদের নৈমিত্তিক ছুটির ক্ষেত্রেও রয়েছে বৈষম্য। শ্রম আইনের ১১৫ ধারায় বলা আছে, ‘একজন শ্রমিক বছরে পূর্ণ মজুরিতে ১০ দিনের নৈমিত্তিক ছুটি পাবে। তবে শর্ত থাকে যে, এই ধারার কোনো কিছু চা-বাগানের অধীনে নিযুক্ত শ্রমিকের জন্য বলবৎ হবে না।’
শ্রম ও কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী মো. মুজিবুল হক বলেন, ‘আইনটি হয়েছে ২০০৬ সালে। এখানে বৈষম্যমূলক কিছু থাকলে চা-বাগানের শ্রমিক সংগঠনের উচিত এটির পরিবর্তন নিয়ে কথা বলা। যদি তাদের কাছ থেকে এমন দাবি আসে, তবে আমি দেখব।

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s