শ্রমিক আন্দোলন….

শ্রমিক আন্দোলন (১৯৪৭ পর্যন্ত) ১৯৪৭ সালের পূর্বে বাংলার পূর্বাঞ্চলে (বর্তমান বাংলাদেশে) খুব অল্পই শিল্প প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছিল। এর মধ্যে চট্টগ্রাম ও সিলেটের প্রায় ২৫টি চা-বাগানে কর্মরত ছিল প্রায় ১২,০০০ শ্রমিক। ৬টি টেক্সটাইল মিলে (৪টি ঢাকায় এবং ১টি কুষ্টিয়া ও ১টি খুলনায়) শ্রমিকের সংখ্যা ছিল প্রায় ১০,০০০। চট্টগ্রাম বন্দরেও কিছুসংখ্যক শ্রমিক কর্মরত ছিল। প্রধানত ছোটনাগপুর অঞ্চলের আদিবাসী সম্প্রদায়ের মধ্য থেকেই চা-বাগানের শ্রমিক নিয়োগ করা হতো। অন্যরা প্রধানত ছিল স্থানীয় হিন্দু ও মুসলমান সম্প্রদায়ের।

খিলাফত আন্দোলন ও অসহযোগ আন্দোলনের সময় (১৯২০-২২) প্রথম শ্রমিক অসন্তোষের লক্ষণ দেখা যায়। আন্দোলনরত চা-বাগান শ্রমিকরা দল বেঁধে সিলেটের চারগোলা উপত্যকার (আসাম) চা-বাগান ছেড়ে চলে যায়। এদের প্রতি সহমর্মিতা প্রকাশ করে ১৯২১ সালের মে মাসে ইস্ট বেঙ্গল রেলওয়ে ও চাঁদপুর স্টিমার সার্ভিসের কর্মচারীরা ধর্মঘট শুরু করে। ধর্মঘটী কুলীরা চাঁদপুরে খুবই অসহায় অবস্থায় পড়ে এবং নিরতিশয় দুঃখ কষ্ট ভোগ করে। কিন্তু রাজনৈতিক দৃষ্টিতে বাংলার অসহযোগ আন্দোলনে এটি একটি বড় বিজয় হিসেবে চিহ্নিত হয়েছিল। অবশেষে ১৯২১ সালের আগস্টে গান্ধীর অনুরোধে ধর্মঘটের অবসান হয়। জে.এম সেনগুপ্তের নেতৃত্বে ১৯২১ সালের এপ্রিল-মে মাসে চট্টগ্রামে সংঘটিত বার্মা অয়েল কোম্পানির শ্রমিক অসন্তোষ বিশেষ উল্লেখযোগ্য।

১৯২৭ সালে ঢাকেশ্বরী কটন মিল শ্রমিক ইউনিয়ন গঠিত হয়। কিন্তু প্রতিষ্ঠার পরবর্তী চার মাসের মধ্যে পরপর কয়েকটি ধর্মঘটের ফলে ইউনিয়নটি দুর্বল হয়ে পড়ে। মহামন্দার কারণেও শ্রমিক আন্দোলনে ভাটা পড়েছিল। আন্দোলনগুলির পেছনে প্রধানত কম্যুনিস্ট তৎপরতার ভূমিকা ছিল। তাই শিল্প প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপকগণ কংগ্রেস ও অনুশীলন সমিতির মতো অ-কম্যুনিস্ট সংগঠনগুলিকে সহায়তা দিতে থাকেন, যাতে কম্যুনিস্টদের যুদ্ধংদেহি তৎপরতায় আন্দোলন দীর্ঘস্থায়ী না হতে পারে। ১৯৩৭-৪০ সালের মধ্যে সংঘটিত বস্ত্রশিল্প প্রতিষ্ঠানের উপর্যুপরি ধর্মঘট ছিল খুবই তীব্র। এসব ধর্মঘটের মধ্যে কুষ্টিয়ার মোহিনী মিলে চারটি (ফেব্রুয়ারি-মে ১৯৩৭, জুলাই-সেপ্টেম্বর ১৯৩৭, আগস্ট-অক্টোবর ১৯৩৯ এবং ফেব্রুয়ারি-এপ্রিল ১৯৪০) এবং ঢাকেশ্বরী মিলে দুটি ধর্মঘট (জুলাই ১৯৩৯ ও জানুয়ারি ১৯৪০) সংঘটিত হয়েছিল। কিন্তু এসব আন্দোলন সুসংগঠিত রূপ লাভে ব্যর্থ হয়। স্বভাবতই তা কম্যুনিস্ট নিয়ন্ত্রিত শ্রমিক ইউনিয়নের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। তাই ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত আর তেমন আন্দোলনের পরিসংখ্যান পাওয়া যায় না। যুদ্ধকালীন সময়ে ঢাকা ছিল অস্বস্তিকর শান্ত অবস্থায়। কিন্তু যুদ্ধ সমাপ্তির পরপরই খুলনার আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র মিলে (ডিসেম্বর ১৯৪৫ থেকে জানুয়ারি ১৯৪৬) এবং ঢাকার চারটি মিলে (ফেব্রুয়ারি থেকে মে ১৯৪৬) সহিংস শ্রমিক অসন্তোষের পুনরুত্থান ঘটে এবং ধর্মঘট অনুষ্ঠিত হয়।

১৯৪২ সাল থেকে চট্টগ্রামের চা-বাগান শ্রমিকরা স্থানীয় কম্যুনিস্ট পার্টির কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত ছিল। তাঁরা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর কালের কিছু সুনির্দিষ্ট অর্থনৈতিক ইস্যুতে কয়েকটি ধর্মঘট করে কিছুটা সাফল্য লাভ করে। দেশ বিভাগের পর কম্যুনিস্ট সংগঠকরা ভারতে চলে যান। এঁদের বেশির ভাগই ছিলেন হিন্দু। ছোটনাগপুর থেকে অভিবাসনকারী চা-শ্রমিকরা এখানে বংশপরম্পরায় স্থায়ী আবাস গড়ে তোলে। তারা তাদের মূল আবাসভূমিতে ফিরে যাওয়ার কোন ইচ্ছা প্রকাশ করে নি। নেতৃত্বের অভাবে শ্রমিক সংগঠনগুলি খুবই দুর্বল হয়ে পড়ে। ইস্ট বেঙ্গল রেলওয়ের শ্রমিকরা ছিল সবচেয়ে সংগঠিত ও রাজনৈতিকভাবে সচেতন। কিন্তু তারা জাতীয়তাবাদী ও কম্যুনিস্ট নিয়ন্ত্রিত ইউনিয়নে বিভক্ত হয়ে পড়ে। [নির্বাণ বসু]

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s