সাংস্কৃতিক বিপ্লব ও লিন পিয়াংয়ের বিষয়ে জেসন আনরুহীর সাথে লিডিং লাইট প্রধান পি এফ এর সাক্ষাতকার

১. মাওবাদিদের মধ্যে যারা আজ ও বিপ্লবের সাথে জড়িত আমরা এখানে তাদেরকে নিয়ে আসি, আমি আজ লিডিং লাইটের প্রধান পি এফ কে আমন্ত্রন করলাম। আমর ধারনা এখন প্রায় সকলেই জানেন যে, লিডিং লাইট কি এবং তৃতীয় বিশ্ববাদ নিয়ে আপনাদের কার্যক্রম। ইহা ইতিমধ্যে জ্ঞান বিজ্ঞান, শিল্প কলা , সাহিত্য, বিজ্ঞান, বিপ্লব এবং মহান সাংস্কৃতিক বিপ্লব নিয়ে ব্যাপক কাজ করেছে। ইহা বিপ্লবের ঐতিহাসিক বিশ্লেষণ ও মার্ক্সবাদের শিক্ষা নিয়ে ব্যাপক আলোচনা করছে। ইতিমধ্যে বেশ কিছু পুস্তক ও প্রকাশ করেছে। তাই আজকের এই সাক্ষাতকারে আপনাকে পেয়ে আমরা আনন্দবোধ করছি। আপনাকে আজকের এই অনুষ্ঠানে স্বাগত জানাই।
জেসন আপনাকে ও ধন্যবাদ জানাই !
২. আপনি লিডিং লাইটের প্রধান । দয়া করে আপনি আমাদেরকে আপনার সংগঠন সম্পর্কে বলবেন কি ?
লিডিং লাইট হলো একটি আন্তর্জাতিক সংগঠন, আমরা সারা বিশ্বে ছড়িয়ে আছিঃ এশিয়া, ল্যাতিন আমেরিকা, ইউরূপ, আফ্রিকা ও উত্তর আমেরিকায়। আমরা বিশ্ব বিপ্লব পরিচালনার জন্য কাজ করছি, একটি বিশ্ব গন আন্দোলন পরিচালনা করছি দুনিয়ার বুক থেকে সকল প্রকার শোষণ, নিপীড়ন, ও কষ্ট এবং যন্ত্রনাকে বিতারনের জন্য। মাওয়ের কথায়, ‘আমরা লড়াই করছি সকল যুদ্বকে থামানুর জন্য’। আমরা অস্ত্র নিয়ে সকল অস্ত্র নিবারনের জন্য।
আমরা লড়াই করছি একটি শান্তি, প্রগতি,ন্যায় বিচার, সহভাগীতা, সৃজনশীলতা, দর্শন, কবিতা, বিজ্ঞান, শিল্প,গান ও আনন্দের জন্য। আমরা লড়ছি, এমন একটি ব্যবস্থার জন্য যেখানে জনগনের সেবা করা যাবে, যেখানে আপনার যন্ত্রনা আমাদের যন্ত্রনা হবে, যেখানে সকল মানুষ এক হবে, যেকানে আমরা প্রকৃতির সাথে, সুপ্রিয় পৃথিবীর সাথে মিলেমিশে থাকব। আমরা এমন এক দুনিয়ার জন্য লড়ছি যেখানে আমরাই আমাদের সেবক হব। আমরা এমন এক প্রকারের প্রকৌশলী খুজছি যারা দুনিয়াকে সকলের জন্য একটি শান্তি ও আরাম দায়ক স্থান হিসাবে গড়ে তুলবেন।
এখন আমরা যে বিপ্লবের কথা বলছি তা কিন্তু নতুন বিষয় নয়। এর আগেও অনেকেই এই কাজ করেছেন। ১৮০০ শতাব্দীতে মহান কার্ল মার্ক্স সেই চেষ্টা করেছিলেন। প্যারিস কমিউনে ও সেই চেষ্টা ছিলো। কিন্তু এর পর বলশেভিক বিপ্লবই ছিলো প্রথম সফল উদ্যোগ। আর এর পর দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্বের পর দ্বিতীয় বারের মত জনগনের বিপ্লবী চেষ্টা সফল হয় চীনের মহান বিপ্লবের ভেতর দিয়ে। এর বিপ্লবকে উচ্চতর স্তরে উন্নিত করার জন্য সাংস্কৃতিক বিপ্লবের সূচনা করা হয়, যেখানে ধারাবাহিক ভাবে মাওবাদীদের প্রচারনা চালানোই ছিলো একটি বিশাল কাজ। সেই কাজ করা হয় ১৯৬৫ সাল থেকে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত। তা অবশ্য ১৯৭৬ সাল নাগাদ অল্প অল্প চালু ছিলো। তবে তা নির্ভর করে সময় কালটা আপনি কিভাবে নির্ধারন করবেন তার উপর।
আমরা সকলেই আজ এক মত যে দুনিয়া সকল জায়গাই এখন বিপ্লবের গতি অনেক ক্ষেত্রে শিতল হয়ে এসেছে। বিপ্লবী আন্দোলন এখন স্থবির ও অনেক জায়গায় স্থবির হয়ে পড়েছে। সর্ব শেষ বিপ্লবের ঢেউটি ফেল করেছে, তবে এর কিছু অবশেষ এখনো বিদ্যমান, মার্ক্সবাদ-লেনিন-মাওবাদ এখন নানা জায়গায় মতান্দ্বতার গোঁড়ামিতে আক্রান্ত হয়ে পড়েছে। তারা এখন আর কোন পথ মানুষকে দেখাতে পারেন না । তারা নিজেরা ও নিজেদের কাজে স্থবির হয়ে পড়েছেন। এখন আমরা যদি সামনে এগোতে চাই তবে আমাদেরকে পিছনের ঘটনাবালী থেকে ভালোভাবে শিক্ষা নিতেই হবে। আমাদের আগের বিপ্লব গুলোতে কি কি ভূল ছিলো ? আর কি কি সফলতা ছিলো তা দেখতে হবে ? আরো কি কি করলে ভালো করা যেত ? আমরা যদি সত্যি আবার বিপ্লব করতে চাই, আমাদেরকে অবশ্যই বিপ্লবী বিজ্ঞানের বিষয়টিকে কম্যান্ডে বসাতে হবে। আমাদের আগের ইতিহাস বিশ্লেষন করতে হবে, আমাদেরকে পিছন ফিরে থাকাতে হবে। সকল বিফলতার গন্ডি পেড়িয়ে সামনে এগোতে হবে। আমাদেরকে বিপ্লবের বিজ্ঞানের বিকাশ ঘটাতে হবে। আর এই প্রচেষ্টাই চালিয়ে যাচ্ছে লিডিং লাইট।
৩. আপনি কেন চীনের সাংস্কৃতিক বিপ্লবের প্রতি আকৃষ্ট হলেন ?
আমার যখন থেকেই বুঝ হয়েছে তখন থেকে আমি নিজেকে একজন সাম্যবাদি হিসাবে তৈরী করার চেষ্টা করছি। বাল্য কাল থেকে দেখে আসছি যে, পুঁজিবাদী ব্যবস্থা সমাজে অন্যায় ও অবিচার করে আসছে। তরুন বয়সেই বিকল্প সমাজ ব্যবস্থা নিয়ে লেখা পড়া শুরু করেছিলাম। এবং কার্ল মার্ক্সের বই মাত্র ১৪ বছর বয়সেই পড়তে শুরু করে দিয়েছি। মাওবাদের সাংস্কৃতিক বিপ্লবের নানা পরীক্ষা নিরিক্ষা আমাকে সেই দিকে আকৃষ্ট করে। মাওবাদি প্রকল্প আমাকে বুঝতে শেখায় যে, প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা আগেই না নিতে পারলে সৌভিয়েতকে যে ভাবে আমলাতন্ত্র ধংস করেছে, সমাজকে যে ভাবে পুলিশি রাষ্ট্রে পরিণত করেছে। তা যে কোন সমাজতান্ত্রিক দেশ কে ও ধ্বংস করে ফেলতে পারে। আমি আবার মাওবাদীদের চরম পন্থার বিষয়ে নিয়ে ও ভাবতাম। তাকে কোন কোন ক্ষেত্রে অর্থহীন মনে হত। সত্যিকার বিপ্লবী চিন্তার সাথে আমি তার একটা গরমিল দেখতে পেতাম। তা আমাকে আকৃষ্ট করলে ও আমার মনে হত যে, মাওবাদ সাম্রাজবাদ বিরোধী লড়াই ও গন সংগ্রামের মাঝে কোন যোগসূত্র নেই। তবে এটাকে একটি ভালো উদ্যোগ বলেই মনে হত। মাওবাদ আসলে তত্ত্ব ও ব্যবহারিক দিক দিয়ে একটি সাংস্কৃতিক বিপ্লবের কথাই বলে। ইহা একটি বিপ্লবী আন্দোলনের রাজপথ । মাওবাদি চিন্তা ধারাকে আরো অগ্রসর করে আমরা একে বলছি আলোকিত সাম্যবাদ। গতানুগতিক ভাবে মাওবাদ কায়েম করতে গেলে, এবং সাংস্কৃতিক বিপ্লবকে টেনে আনতে চাইলে, আজকের দিনে তা চরম ভূল হবে। তবে এই বিষয়ে আরো চিন্তা ভাবনার অবকাশ আছে। ইহা এখন খুবই গুরুত্বপূর্ন ইস্যূ।
৪. এমন কি বিষয় ছিল যা আপনাকে কট্টর পন্থী মাওবাদিদের বিরুদ্বে কথা বলতে বাধ্য করেছে। আর এমন কি ঘটলো যে আপনি বলতে বাধ্য হলেন যে, “ মাওবাদের নামে ভূল চর্চা ও গোড়ামীবাদ চলছে, আমরা নতুন কিছু চাই, এবং এখন যা চলছে তা প্রশ্নাতীত নয়”?
মাওবাদিরা প্রায়স বলেন যে, চীনের সাংস্কৃতিক বিপ্লব মানব সভ্যতার ইতিহাসে একটি যুগান্তকারী ঘটনা ছিলো। এখন আমি সেই বিষয় নিয়ে পড়া শুনা করতে শুরু করেছি, আমি দেখছি গোড়ামীবাদি মাওবাদিরা সাংস্কৃতিক বিপ্লব সম্পর্কে তেমন কিছু জানেনই না। আপনি হয়ত ভাববেন যদি তারা সাংস্কৃতিক বিপ্লবের বিশ্বাসী হয়ে থাকেন যে বিপ্লবী তত্ত্বের উচ্চতর স্থর হলো সাংস্কৃতিক বিপ্লব তা হলে তো এদের এই বিষয়ে ব্যাপক জ্ঞান থাকার কথা । এখন আমি যে সকল বিষয় আবিস্কার করেছি তাতে দেখা যাচ্ছে যে, গোড়ামীবাদি মাওবাদিরা সেই ঘটনা বহুল সময় সম্পর্কে খুবই কম জ্ঞান রাখেন। এমন কি তারা সেই সময় সম্পর্কে কোন সাধারন প্রশ্নের ও জবাব দিতে পারেন না । যেমন, আমি কখন ও তাদের কাছ থেকে জানতে পারি নাই যে সাংস্কৃতিক বিপ্লবটা কেন ব্যার্থ হয়ে গেল। গোড়ামীবাদি কতিপয় মাওবাদি একটি ভাসাভাসা জবাব দিয়ে থাকেন যে, ১৯৭৬ সালে চার কু চক্রীর অভ্যত্থানের ফলে পুঁজিবাদ ফেরে এসেছে। আসলে এটা কোন উত্তরই হলো না । মাওবাদীদের মতে, ক্রুসচেভের প্রতিবিপ্লবের ফলে সৌভিয়েত ইউনিয়নে পুঁজিবাদ ফিরে আসে। যদি মাওবাদিরা দাবী করেন যে সাংস্কৃতিক বিপ্লব হলো বিপ্লবের উচ্চতর স্তর তাহলে স্ট্যালিন আমলের শেষ প্রান্তে এসে যে চক্রান্ত করে পুঁজিবাদ কয়েম করা হয়েছিলো তা হলে চীনের মানুষ কেন সেখান থেকে শিক্ষা নিয়ে চিনে পুঁজিবাদ কয়েমের পথ আটকে দিতে ব্যার্থ হলো ? মাওবাদীদের মতে মাওবাদ ই হলো বিপ্লবী বিজ্ঞানে সব চেয়ে উচ্চতর স্তর, অথচ তারা কি তা দিয়ে প্রতিবিপ্লব ঠেকাতে পারলেন ? মাওবাদিরা যদি স্বীকার করেন যে চীনে প্রতিবিপ্লব হয়েছে। তবে তারা কেন মাওবাদি তত্ত্ব সাংস্কৃতিক বিপ্লব দিয়ে তা আটকে দিতে পারলেন না ? মাওবাদীদের লাল মহা মানব তত্ত্ব কোন জিনিস অকার্য কর করে দিলো যার মূল মন্ত্র হলো যে কোন বিপ্লব নির্ভর করে তার নেতার উপর। সেই লাল মহা মানবের উপর। মার্ক্সবাদ সর্বদাই মহা মানব তত্ত্বের সমালোচনা করে এসেছে। আবার যদি ও মাওবাদিরা তোতা পাখীর মত আওড়ায়, “ জনগণই হলো সত্যিকার নেতা, তারাই ইতিহাস রচনা করে থাকে”। কিন্তু বাসতবতা হলো চীনে পুঁজিবাদই সকলের চেয়ে বড় হয়ে নিজের অস্থিত্ব প্রমান করল। তাদেরকে তাদের জনগণ পুঁজিবাদের কাছ থেকে রক্ষা করতে পারে নি । সেই ক্ষেত্রে একটা প্রশ্ন বারা বার ফিরে আসে যে , এমন কি ঘটলোঃ যা বিপ্লবকে ভেতর থেকে এমন ভাবে দূর্বল করে দিলো যে তা কোন ভাবেই “প্রতিবিপ্লব” কে ঠেকাতে পারলো না ? কি কি ব্যার্থতা ছিল যা এই প্রতিবিপ্লবের সূচনা করতে পারল ? সেই প্রতি বিপ্লবের ক্ষেত্রে ব্যাক্তিদের কার কি কি ভূমিকা ছোলো ? সত্যিকার ভাবে সেই পরিস্থিতে বস্তু তাত্ত্বিক বিশ্লেষণের বিরাট ঘটতি ছিলো। গোড়ামীবাদ তাদেরকে মারাত্মক ভাবে আক্রান্ত করেছিলো। বন্দ্বুরা বলেই চলেছেন যে, প্রতিবিপ্লবের কারনেই চীনের মহান বিপ্লবী ব্যবস্থা ভেঙ্গে পড়েছে। এসব বলতে বলতে তাদের মাথার চুল উঠিয়ে ফেলেছেন।
৫. সম্প্রতি আপনার একটি বই প্রকাশিত হয়েছে, আমি আগেই বলেছি বিপ্লবের ঢেউ উঠছে, আপনি সেই বইয়ে কি কি নতুন বক্তব্য হাজির করেছেন ?
সমূদ্রে ঢেঊ উঠছে, আকাশে মেঘের ঘনঘটা। আমি আমার প্রথম বইয়ে সাংস্কৃতিক বিপ্লবের সেই ঢেউয়ের আবাস দিয়েছি। আমি মাওয়ের প্রথম জীবনের কবিতা থেকে সেই বইয়ের শিরোনাম গ্রহন করেছি। মাও এক জন মহান কবি ছিলেন। মহা উল্লম্ফন যা ১৯৬০ সাল থেকে ১৯৬৬ সাল পর্যন্ত সময়কে নিয়ে এই বইয়ের প্রথম কভার তৈরী করেছি। এই বইয়ে সাংস্কৃতিক বিপ্লবের উত্থান ও বিকাশ নিয়ে কথা বলেছি। এই সকল বিষয় সর্বদাই বুর্জোয়া ঐতিহাসিক গন এড়িয়ে গেছেন। এই বিষয় গুলো আপনি মাওবাদীদের সাহিত্যে ও পাবেন না ।
আমি সেই পুস্তকে সাংস্কৃতিক বিপ্লবের দূর্ঘটনা অর্থাৎ কিছু দূর্ঘটনা ও ছিলো। আপনি প্রচলিত মাওবাদি ও অন্যান্য লিখকদের লিখায় দেখতে পাবেন, যে মাওসেতুং নিজেই সংশোধনবাদিদেরকে সাংস্কৃতিক বিপ্লবে সম্পৃক্ত করার ব্যবস্থা নিয়েছিলেন। মাওয়ের সেই ব্যবস্থার কারনে চার কু চক্রী ও অন্যান্যদের মাঝে সংঘাত দেখা দেয়। এই প্রসঙ্গে ইয়ু উয়েন তার রচনায় তাদের সংঘাতের বর্ননা করেছেন। এতে সাধারন মানুষ ও জড়িত ঝয়ে পড়েন। গতানুগতিক লিখকদের লিখায় পাবেন যে, মাও নিজেই কোন কোন ক্ষেত্রে সংঘাত কামনা করেছিলেন। যা সাম্যবাদিদেরকে ক্ষমতায় আনন্তে সহায্য করবে। সাংস্কৃতিক বিপ্লবের প্রারম্ভে কয়েক ডজন ক্ষেত্রে সংঘাতের অস্থিত্ব দেখা যায়। কিছু কিছু তরুন মাওবাদি লিখক বলেছেন, মহা উলম্ফন সংশোধন পন্থার লোকদের বিরুদ্বে যাচ্ছিলো। একটি মারাত্মক সঙ্ঘতা চলে অর্থনৈতিক, দার্শনিক, সাংস্কৃতিক, সাহিত্য, ও ব্যবহারিক আচার ব্যবহারের ক্ষেত্রে। ইয়ু অয়েন ওয়া ফু হানের নাটকের সামালোচনা করেন। একেই ভাবে বিপ্লবীরা নিজেদের দলের ভেতরে ও সংশোধন করতে চাইলচিলেন। তারা শিক্ষা, ও বুদ্বি বৃত্তিক বিকাশের ক্ষেত্রে যুগান্তকারি পরিবর্তন করতে চাইছিলেন। কিন্তু কেহ কেহ এর বাধা হয়ে দাঁড়ায়। সাংস্কৃতিক বিপ্লবের একটি উল্লেখ যোগ্য দিক ছিলো সামাজতান্ত্রিক শিক্ষার প্রসার করা । যখন সেই পরিবর্তনের হাওয়া চার দিকে চড়িয়ে পড়ে তখনই ১৯৬৬ সালে ১৬ নম্বর সার্কুলার জারি করে তা থামিয়ে দেবার চেষ্টা করা হয়। এটা ছিলো সমাজতন্ত্রের বিরোধী শক্তির প্রচণ্ড আঘাত। তারা সাংস্কৃতিক বিপ্লবের পথে মারাত্মক বাধার সৃষ্টি করে ফেলে।
আমার বইয়ে আরো একটি দিক ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। সেই বিষয়টি হলো সাংস্কৃতিক বিপ্লবে লিনপিয়াংয়ের ভূমিকা, যিনি চীনের প্রতিরক্ষা মন্ত্রক ছিলেন। যখন চীনে শিক্ষার কার্যক্রমের বিপ্লব চলছিলো তখন তিনি তার সেনা বাহিনীকে সেই ভাবে গড়ে তুলতে পারছিলেন না । তাই তার সেনা বাহিনীতে সমাজতান্ত্রিক শিক্ষা আন্দোলনের প্রভাব কম ছিলো। মাওবাদিদের সংখ্যা ও সেখানে ছিলো কম। তখন ও দলের ভেতরে সামরিক বাহিনী তেমন কোন ভূমিকা পালন করতে পারতেন না । তাই আমার বইয়ে উন্নয়নকে সামনে আনা হয়েছে কিন্তু সাংস্কৃতিক বিপ্লব বা আদর্শকে তোলে ধরা হয়নি, কিন্তু প্রতিস্টানিক দ্বৈততাকে তুলে ধরার পাশাপাশি চলমান ঐতিহ্য ও আমলাতান্ত্রিকতাকে আলোচনা করা হয়েছে। সেই ক্ষেত্রে লিন পিয়াং এর অবদান কে তোলে ধরার প্রায়াস ছিলো। লিন সংশোধনবাদিদের মোকাবেলায় সেনাবাহিনীতে, রাষ্ট্রে ও পার্টিতে দ্বৈত ক্ষমতা কঠামোর উত্থান ঘটান। তিনি সেনাবাহিনীতে সংশোধনবাদ বিরোধী একটি ভিত্তি গড়ে তুলেন, তিনি একই সাথে পার্টিতে, রাষ্ট্রে মাওবাদের আদর্শিক ভিত্তি মজবুত করেন। সেনা বাহিনী থেকে নেতৃত্ব তৈরী হতে থাকে । যেমন জিয়াং কুইন। প্রতিটি প্রতিস্টানেই দুটি ক্ষমতা কাঠামো গড়ে উঠতে থাকে, ইহা লিন পিয়াংয়ের একটি বড় অবদান হিসাবে দেখা যায় যে তিনি ই এই ধারার সৃজন করেন। সেই পদক্ষেপ গুলো লিনকে তার নিজস্ব পরিসর থেকে সাধারন মানুষের সাথে মেশার সুযোগ করে দেয়। তিনি চাইছিলেন একটি নতুন ক্ষমতা কাঠামো, আকর্ষনীয় নেতৃত্ব, নতুন প্রাশাসক শ্রেনী, ও বিপ্লবী ব্যাক্তি স্বত্ত্বার বিকাশ । এই সকল বিষয়াবলী নিয়েই আমার পুস্তকে আলোচনা করা হয়েছে। যা এই পর্যন্ত যারা লিখেছেন যেমন মাওবাদি, সংশোধন বাদী ও বুর্জোয়া বুদ্বিজীবী তারা কেহ ই এই সকল বিষয়ে বিস্তারিত লিখেন নি।
এখন পর্যন্ত আমি যে সকল বিষয়ে গবেষনা করেছি এর মধ্যে এই গুলো বেশ প্রাগ্রসর ইস্যূ। এই পর্যন্ত আমি যে সকল বিষয় নিয়ে আলোচনা করেছি তা সুসংগঠিত ভাবে ১৯৭০ সালের পর থেকে বিস্তারিত আলকপাত করেছি। কৃষি, শিল্প ও আন্যান্য বিষয় তুলে ধরাই ছিলো প্রধান উদ্দেশ্য। লিন পিয়াংয়ের সাথে সম্পৃক্ত প্রতিটি বিষয়ে আমি কথা বলেছি ।
৬. আপনি আপনার আলোচনায় বরাবরই লিন পিয়াং সংক্রান্ত বিষয়ে গোঁড়ামিপন্থী মাওবাদিদের সমালোচনা করেছেন। এতে আমাদের মনে হয় আপনি লিনের মৃত্যুর বিষয়ে সন্দ্বেহ করছেন। আপনি বলছেন লিন পিয়াং ছিলেন একজন সত্যিকারের বিপ্লবী । আপনি লিনের প্রতি এত বেশী জোর দিচ্ছেন কেন ?
এটা আমার ব্যাক্তিগত অনুভুতি, আমার কাছে মনে হয়েছে লিন পিয়াং ও সাংস্কৃতিক বিপ্লব সম্পর্কে জানার বিষয়ে গোঁড়ামি পন্থীদের মাঝে ব্যাপক ত্রুটি বিদ্যমান রয়েছে। একটি মজার বিষয়ে হলো যে আমি যখন এই বিষয়ে লেখা পড়া করতে থাকি তখনই আমার নিকট বেশ কিছু অসঙ্গতি ধরা পড়ে। প্রথম দিকেই দেখতে পাই যে, লিন সম্পর্কে অফিসিয়াল বক্তব্য ও চীনের গন মাধ্যমে প্রকাশিত তথ্যের মাঝে আমি ব্যাপক গড়মিল খোঁজে পাই। বেইজিং রিভিউর বক্তব্যে বলা হয়েছে, লিন পিয়াং রাজনৈতিক অপরাধের সাথে জড়িত। তিনি গোপনীয় ভাবে উৎপাদন শক্তি তত্ত্বের সমর্থক চক্রের সাথে কাজ করেছে, তিনি সৌভিয়েত কৌমিংতাং এর এজেন্ট ইত্যাদি । সত্যকার ভাবে মাওবাদি রাজনীতির উচ্চতর স্তরের ব্যাক্তি ছিলেন তিনি। তাকে সাংস্কৃতিক বিপ্লবের প্রতীক হিসাবে বিবেচনা করা হয়। তাকে অত্যান্ত সমিহ করে বলা হত, “ মওয়ের সত্যিকার উত্তরাধিকার”, “মাওয়ের ভালো ছাত্র”, “ মাওয়ের সহযোদ্বা”, “চীনের মহান জেনারেল”, ইত্যাদি। জনগন প্রায়স বলতেন, “ চেয়ারম্যান মাও দির্ঘ জীবি হোন এবং লিন পিয়াং বেঁচে থাকুন”। ১৯৬৯ সালে কমিউনিস্ট পার্টির নবম কংগ্রেসে মাও নিজেই লিখে দেন যে লিন পিয়াং হবেন তার উত্তরাধিকার। সাংস্কৃতিক বিপ্লবের প্রধান প্রধান বক্তব্য সমূহ লিন পিয়াং কর্তৃক লিখিত ছিলো। এমন কি তিনিই মাওয়ের পক্ষে বেশীর ভাগ বক্তব্য রেকর্ডিং করেন। তাই বলছি নিজেকে প্রশ্ন করুন কেন তাহলে এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হলো ? মাওবাদিদের মধ্যে এমন কি পচন ধরেছিলো যে তারা তাদের ক্ষমতার সূরক্ষা দিতে পারেন নাই ? যদি এমন টি সত্য হয় যে, মাও লিন পিয়াং কে শত্রু মনে করতেন তা হলে তিনি কেন সাংস্কৃতিক বিপ্লবের সকল গুরুত্ব পূর্ন কাজ তাকে দিয়ে করাচ্ছিলেন? অবশ্য মাওবাদিরা লিনের পরবর্তী সময়ে এই ক্ষেত্রে নানা রহস্য সৃজনের চেষ্টা করেছেন।
মাওবাদীদের এই রকমের অসংলগ্ন বক্তব্য আমাকে লিন সম্পর্কে আরো বেশী জানতে আগ্রহী করে তোলে। আমি জানতে চাইলাম মাওবাদি প্রকল্প সাংস্কৃতিক বিপ্লব সম্পর্কে যিনি এত নিবিড় ভাবে কাজ করছিলেন তিনি কেমন করে বিদ্রোহী, দালাল ও গোয়েন্দা হয়ে উঠলেন । কেমন করে মাওবাদের একজন নিবেদিত প্রান মানুষ জিনি মাওবাদের বিকাশে প্রতিনিয়ত কাজ করছিলেন তিনি কি ভাবে মাওবাদের শত্রুতে পরিনিত হলেন ? এ ছাড়া আমার আর কিছু জানার ছিল না । আমি এখন ও চীনের নেতৃত্ব, চলমান ঘটনা প্রবাহ, তাদের ব্যাক্তিগত ইতিহাস ও রাজনৈতিক বিশ্লেষণ করে যাচ্ছি। এখন সমাজতান্ত্রিক ইতিহাস বিশ্লেষণে একটি বড় সমস্যা হলো যে, চলমান বিষয় আসয় অনেক ক্ষেত্রেই অসত্য হিসাবে তোলে ধরা হচ্ছে। আমি দেখতে পাচ্ছি যে, লিন পিয়াং সম্পর্কে রাজনৈতিক শ্রুত অনুসারে বর্ননা হাজির করা হয়েছে। লিন কে একজন অতি বাম নেতা হিসাবে দেখানো হয়েছে। আবার অতি ডান হিসাবে ও তাকে চিত্রিত করা চেষ্টা করা হয়েছে এর পর আবার তাকে অতিবাম হিসাবে দেখানো হয়েছে। আমি আরো দেখলাম যে লিনের সম্পর্কে ঐতিহাসিক সত্যতাকে একেবারে গুরুত্ব প্রদান করা হয়নি। আগের মত এখনো গোঁড়ামি পন্থী মাওবাদিরা কোন বিষয়ের সাধারন বর্ননা ও তার যৌক্তিকতা সম্পর্কে ওয়াকিব হাল নন। তারা এর পার্থক্য ও বুঝেন না । কেহ যদি বলেন যে করিম ও রহিমের অপরাধ সেলিমের মতই তা সত্য না ও হতে পারে। একেই ভাবে তারা অন্যান্যদের মতই লিনপিয়াঙ্গকে দোষারূপ করে এসেছেন। আপনি দেখবেন মাওবাদিরা এখন তোতা পাখির মত শোনা কথা নিজেরা বার বার আওড়ে যাচ্ছেন। বেইজিং রিভিউ যা বলছে তারা ও তাই বলে যাচ্ছেন। তারা একে অন্যকে তাই বলে আনন্দ পাচ্ছেন। অনাকাঙ্ক্ষিত হলে ও অত্যি যে এই ধরনের পুলিশি বক্তব্য বিপ্লবী ইতিহাসে বার বার দেখা গেছে। এই পরিস্থিতিতে কাঊকে সত্যিকার বিজ্ঞানের কথা শোনানো বড়ই কঠিন ব্যাপার।
আমাকে আরো একটি বিষয় সাংঘাতিক ভাবে আলোড়িত করে যে, যে সকল গোঁড়ামি পন্থী মাওবাদি এই দাবী করেন যে সাংস্কৃতিক বিপ্লব হলো মানব ইতিহাসের একটি উচ্চরত স্থর, অথচ তারা সেই সম্পর্কে তেমন কিছুই বললেন না, তারা এর কোন বিশ্লেষণ ও প্রকাশ করলেন না । তারা যা করলেন তা হোল বেইজিন ভিত্তিক রিভিউ যা প্রকাশ করল তারা তাই তোতা পাখীর মত আওড়াতে লাগলেন। এবং বিপ্লবের উদ্দেশ্যে ভ্রমন কারীদের কাছে সেই কথা গুলোই ইনিয়ে বিনিয়ে বলতে থাকলেন। এক মিনিট ভেবে দেখুন । যারা বলেন সাংস্কৃতিক বিপ্লব দুনিয়ার শ্রেস্ট জিনিস, সর্ব মহান, খুবই গুরুত্ব পূর্ন বিষয় তা হলে তারা কেন সেই বিপ্লবকে ফিরিয়ে আনার জন্য লড়াই করছেন না । এমন কি তারা বিষয়টি ভালো ভাবে বুঝার জন্য পড়া শোনা ও করতে আগ্রহী নয়। আমরা কি বুঝলাম এতে, গোঁড়ামি পন্থী মাওবাদিরা আসলে এর প্রতি কোন প্রকার আগ্রহ ই দেখান না, তারা বিজ্ঞানের প্রতি আস্থাশীল ও নয়। আসলে তারা সাংস্কৃতিক বিপ্লবের কথা মূখে বলে কেবল বাহ বাহ কুড়াতে চায়। তারা বিজ্ঞানকে কোন প্রকার গুরুত্ব ও দিতে চায় না, তারা গোড়ামীকেই বেশী পছন্দ করেন। এই ধরনের মানুষেরা নিজেদেরকে বিপ্লবী বললেও আসলে উরা হূজ্জা ও ট্রটস্কি পন্থীদের মতই আচরন করেন। তারা বিজ্ঞানের কথা বললে ও তারা আদতে বিজ্ঞানকে অস্বীকারই করে থাকেন। তারা আদর্শিক ভাবে আসলে উপ দলীয় কোন্দলেই লিপ্ত কিন্তু আবার ঐক্যের কথা ও বলেন, আসলে তাদের কার্যক্রম মূলত কোন বিপ্লবী বিজ্ঞান ভিত্তিক দিক নির্দেশনা প্রদান করে না । লিডিং লাইটের সাথে এখানে তাদের পার্থক্য বিদ্যময়ান। লিডিং লাইট সাম্যবাদ আদতে একটি সত্যিকার বিজ্ঞান ভিত্তিক পথ নির্দেশোনা । যা নিপিড়িত মানুষের মুক্তির দিশা ।
আমরা আসলে লিন পিয়াং কে আমাদের একজন পথ নির্দেশক হিসাবে গ্রহন করেছি। গোঁড়ামি পন্থা ও অফিসিয়াল বিজ্ঞপ্তির সাথে আমরা একেবারেই একমত পোষণ করি না । পুঁজিবাদী সংশোধন পন্থী ও গোঁড়ামি বাদিরা মিথ্যার উপর দাঁড়িয়ে আছেন। যারা বিজ্ঞান অনুসারে মাওবাদের চর্চা করেন না বা সত্যিকার মাওবাদকে মেনে চলেন না তাদেরকে মাওবাদি সংস্থা বা সংগঠন হিসাবে গ্রহন করা যায় না । মার্ক্সের একটি বিখ্যাত উক্তি হলো যে, তিনি মার্ক্সবাদি নন। এই ধরনের কথা মার্ক্স, লেনিন, মাওয়ের মতে বিজ্ঞানকে বিভ্রত করা, এই ধরনের বক্তব্য বিজ্ঞান সম্মত নয়। লিডিং লাইট বিজ্ঞান ভিত্তিক ও সহজ পথ। লিন পিয়াং এর কথায় বলা যায় স্পস্ট কর, পরিস্কার কর, একজন ব্যাক্তির নাম। এটা হলো প্রতিকি বিষয়। আর আমরা তা করতে গিয়ে আমরা বালির উপর একটি লাইন এঁকে দিলাম। আমরা যারা লিডিং লাইট আমরা বলছি যে, কোন প্রকার গোঁড়ামি পন্থা, অবৈজ্ঞানিক বিষয় গ্রহন যোগ্য নয়। অনেক হয়েছে। এবার সত্যিকার ভাবে জনগণের সেবা করুন। সত্যের সেবা করুন । মিথ্যার নয়।
৭. প্রায় সকলই বলেন যে লিন পিয়াং সাংস্কৃতিক বিপ্লবের ক্ষেত্রে এত গুরুত্ব পূর্ন কেন ?
একটা কথা আমাদের মনে রাখতে হবে যে কেবল মাত্র সামরিক বাহিনীর মানুষেরা লিন পিয়াং ছাড়াই সাংস্কৃতিক বিপ্লবের সূচনা করে ফেলেছিলেন। প্রকৃত পক্ষে লিন পিয়াং ছিলেন বিপ্লবের প্রতীক ।
প্রতমতঃ মনে রাখবেন, মার্ক্সবাদিদের মতে রাষ্ট্র একক ভাবে একটি বিশাল সন্ত্রাসের কেন্দ্র। রাষ্ট্রই প্রকাশ্যে “সশস্ত্র বাহিনী তৈরী করে”। কেননা সেই সামরিক বাহিনির কিন্তু একটি বিপ্লবী গন চরিত্র থাকে। তবে চীনের সামরিক বাহিনীর মাঝে একটি বিচ্যুতি লক্ষ্য করা যায় ১৯৪৯ সালের পর, ক্ষমতায় অরোহনের ও বিপ্লবের পর পর ই। ইহা নিজেকে পেশাগত ভাবে আত্ম নিয়োগের দিকে মনোনিবেশ করে। তারা ক্রমে জনগণ থেকে নিজেদেরকে বিচ্ছিন্ন করতে শুরু করে। লিন পিয়াং সামরিক বাহিনীকে তাদের চলমান গতি ধারার পরিবর্তন ঘটানোর প্রায়াস পান। তিনি পুনঃ সামরিক বাহিনীকে একটি বিপ্লবী বাহিনীতে রূপান্তর করেন। তিনি সামরিক বাহিনীকে তার মূলের দিকে দাবিত করেন, তাকে গন-বাহিনীতে পরিণত করেন। তিনি রাজনীতিকে পেশা, প্রকৌশল বা সামরিক আচার হিসাবে নয় বরং গন মানুষের স্বাভাবিক জীবনের সাথে সম্পৃক্ত করে দেন। তিনি সামরিক বাহিনীকে বিপ্লবী রাজনীতি ও গনমানুষের সাথে সম্পৃক্ত করেন। পদের গৌরব বিদূরীত করেন। সামরিক বাহিনী রাজনীতি নিয়ে পড়া শোনা শুরু করে এবং জনগণের সাথে কাজ করতে আরম্ভ করে দেয়। সামরিক বাহিনী সাংস্কৃতিক কর্মে জড়িত হন। অফিসাররা সকলের সাথে মিশে কাজ কর্ম করতে থাকেন। সামরিক বাহিনী জনসাধারনের সাথে মিশে অর্থনৈতিক কাজ কর্মে জড়িত হন। লিন পিয়াং সামরিক বাহিনীকে “ইয়ানের চেতনার” সাথে যুক্ত করেন। গেড়িলা কর্মের চেতনা ও জন সেবায় সামরিক বাহিনী ব্যাপক ভাবে অংশ গ্রহন করেন।
দ্বিতিয়তঃ লিন পিয়াং পার্টির ভেতরে সাংস্কৃতিক বিপ্লবের একটি ভিত্তি তৈরী করেন। সেখানে সংশোধন পন্থার লোকেদের প্রভাবের কারনে প্রকৃত মাওবাদিদের ক্ষমতা কমতে শুরু করেছিলো। পার্টির ভেতর আদর্শহীন লোকেরা মাওসেতুং কে এক জন আধ্মাতিক নেতা বানিয়ে নিজেদের ইচ্ছে মত সব কিছু করতে চাইছিলেন। সংশোধন পন্থীদের এটা ছিলো একটি চক্রান্ত। সেই সময়ে মাওবাদিরা আদর্শের বিষয়ে নিয়ন্ত্রন করলে ও সংশোধনবাদিরা রাষ্ট্রের অন্যান্য বিষয়ে ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করে রেখেছিলো। সেই মাও বলছিলেন আমাকে বুদ্বের মাটি দিয়েই তৈরী করা হয়েছে তবে তাঁর মত কোন ক্ষমতা আমার নেই। মাও সেই পরিস্থিতি পরিবর্তনের জন্য ১৯৬০ সালে চেষ্টা করেছিলেন। মাও সেই সময়ে সমাজতান্ত্রিক শিক্ষা আন্দোলনের সূচনা করেন। তিনি মাওবাদের চেতনাকে প্রসারনের চেষ্টা করলেও সংশোধন পন্থী আমলাদের কারনে তা আর তেমন ভাবে এগোতে পারে নাই।
মহা উলম্ফনের সময়ে চীনের মানুষে একজন প্রকৃত মাওবাদি নেতা পেয়েছিলেন, আর তিনি হলেন লিন পিয়াং। তিনি একদিকে ছিলেন চীনের প্রতি রক্ষা মন্ত্রী অন্যদিকে ছিলেন সেনাবাহিনীর প্রধান। সেই কারনে তিনি সেনা বাহিনীকে মাওবাদি শিক্ষায় শিক্ষিত করে গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন। মাওবাদিদের শ্লোগান ছিলো “রাজনীতিকে কমান্ডে রাখুন”! ইহা ও লিন পিয়াংয়ের নিকট থেকেই এসেছে। তিনি ই “ক্ষুদ্র লাল বই” প্রকাশের উদ্যোগ নেন যেন সকলেই মাওবাদের আসল শিক্ষার সাথে পরিচিত হতে পারেন। লিন পিয়াং কেন্দ্রীয় ভাবে সামরিক বাহিনীকে একটি অনুগত্য শীল বাহনীতে পরিণত করতে চেষ্টা করেন। তাই যখন পার্টি মাওবাদীদের উদ্যোগের বিরোধিতা করেন তখন আমলারা বিকল্প পথে কাজ করতে থাকে। সত্যিকার অর্থে সামরিক বাহিনী দ্বৈত ক্ষমতা কাঠামো তত্ত্ব নিয়ে কাজ করেন। সাংস্কৃতিক বিপ্লবের সময়ে আসলে সেই কাজটি ই করা হচ্ছিলো। পুরাতন শক্তির বদলে নতুন শক্তির উত্থান করা। মাওসেতুং এর স্ত্রী জিয়াং কিং যিনি চার খলিফার একজন। তিনি সাংস্কৃতিক বিপ্লবে ব্যাপক ভূমিকা পালন করেন। তিনি তাঁর রাজনীতি শুরুই করেছিলেন সামরিক বাহিনীর এখন উপদেষ্টা হিসাবে, এই পদবী টা ও লিন পিয়াং তাকে “প্রদান” করেছিলেন।
তৃতীয়তঃ ১৯৬৬ সাল থেকে ১৯৬৮ সালে যে আন্দোলন চলছিলো সেই সময়ে লিন পিয়াংয়ের সামরিক বাহিনী তাঁর সূরক্ষার জন্য ব্যাপক ভূমিকা পালন করে। সামরিক বাহিনী মাওবাদিদের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করে সহযোদ্বার ভূমিকা নেয় । লিনের বাহিনী সাংস্কৃতিক বিপ্লবকে সূরক্ষা দেয় লাল ফৌজের মত। ফলে জেকবিয়ান আন্দোলনের মত মাওবাদিরা ও কাজ করার চমৎকার সুযোগ পায়। ইহা সাধারন মানুষকে সংগঠিত করার সুযোগ তৈরী করে এবং সংশোধন পন্থীদেরকে আক্রমন করার মওকা তৈরী করে দেয়। সেই সময় ঘটনা চক্রে পরস্পরের মাঝে সংঘাত অনিবার্য হয়ে উঠলে মাওসেতুং তা বন্দ্ব করতে বলেন। মাও গন আন্দোলনের সমালোচনা শুরু করেন। মাও বললেন আমি চাই শ্রেনী সংগ্রাম, কিন্তু গৃহ যুদ্ব নয়। তাই মাওসেতুং ১৯৬৭ সাল থেকে ১৯৬৮ সাল সময়ে গন আন্দোলন বন্দ্ব করে দেন। তবে, এটা চিন্তা করা ও কঠিন যে সামরিক বাহিনীর তত্ত্বাবধায়নে সাংস্কৃতিক বিপ্লবকে এগিয়ে কত কঠিন ছিলো। যদি সেই সময়ে কিছু সুর চিৎকার, রাজনৈতিক ডামাডোল চলছিলো, এবং চার খলিফার আমলে ও সত্যিকার সাংস্কৃতিক বিপ্লবের কাজ হচ্ছিলো। তবে তাদের মাঝেও দূর্বলতা ছিলো, তাদের পিছনে প্রশাসনিক সমর্থন ছিলো ক্ষীণ। এবং ১৯৭১ সালের পর থেকে তারা আর সামরিক বাহিনীর সমর্থন ও পাচ্ছিলেন না । কেননা ইতি মধ্যেই লিন পিয়াঙ্গকে সড়িয়ে সংশোধনবাদি চক্র ক্ষমতায় বসে পড়েছেন। তিনি পদ চ্যুত হয়েছিলেন মাওবাদ বিরোধী ও জনতার শত্রুদের দ্বারা। তাঁর পর ই দখলদার চক্র ক্ষমতা গ্রহন করেন।
চতুর্থতঃ লিন পিয়াং সত্যিকার ভাবে একটি ভালো বিপ্লবী অর্থনৈতিক নীতিমালা প্রনয়নের চেষ্টা করেছিলেন। গন বিপ্লবের পর, তিনি সামরিক বাহিনীর সহায়তায় মাওবাদ ভিত্তিক একটি যৌথ পরিকল্পিত অর্থনৈতিক নীতি বাস্তবায়নে উদ্যোগ নিলেন। এটা ছিলো মাওবাদ ২.০ বা উল্লম্ফন ২.০ যাকে বলা হয় “ উড়ন্ত উত্থান” । ইহা ছিলো মাওবাদি অর্থনীতির সফল একটি নমুনা । তবে মাওবাদের মৌল ভিত্তির চেয়ে এর মাঝে কিছু পার্থক্য ছিলো। তবে তা মাওবাদের বিরুদ্বে ছিলো না । কিন্তু দূর্ভাগ্য বসত, মাও ক্রমে ডান পন্থার দিকে ঝুঁকে পড়তে থাকেন। সম্ভবত মাও মহা উলম্ফনের ত্রুটি সমূহের দিকে পুনঃ ফিরে আসতে ভয় পাচ্ছিলেন। সেই সময় মাও ও বয়সের ভারে নুয়ে পড়ে ছিলেন। তিনি তারা স্বীয় লাইন থেকে সড়ে আসতে লাগলেন।
সর্ব শেষ, লিন পিয়াং সারা দুনিয়া জোড়ে গন সংগ্রামের সূচনা করতে চেয়েছিলেন। লিন পিয়াংয়ের অনুসারীরা ও এমন একটি রাজনৈতিক নীতি গ্রহন করতে চেয়েছিলেন যার কথা ছিলো বিপ্লবী অগ্রনী বাহিনী সর্বত্র গড়ে তোলা। তারা সর্বহারাদের জন্য কাজ করবেন, দুনিয়া ব্যাপী জন যুদ্বের সূচনা করবেন, কেবল চিনের সংকির্ণ স্বার্থ নয় বরং দুনিয়ার সর্বহারার স্বার্থে কাজ করতে থাকবেন। সৌভিয়েতরা আন্তর্জাতিকতার পথ ছেড়ে দিয়েছেন, জন যুদ্বের পথ ছেড়ে দিয়েছেন। এই পদক্ষেপ গুলোকে মাওবাদিরা প্রথমিক ভাবে প্রচণ্ড রকমে সমালোচনা করেছিলেন। লিন পিয়াং হলেন সেই ব্যাক্তি যিনি রাজনীতিতে গন যুদ্বের তত্ত্বকে কমিউনিস্টদের অন্তরে স্থাপন করেন। তারা বুঝতে সক্ষম হয়েছিলেন যে, সংশোধনবাদের বিপরীত ধারা হলো গন যুদ্বের পথ। ১৯৬৯ সালের নবম কংগ্রেসে লিন পিয়াং বলেছিলেন, “ বিপ্লবই হলো আসল প্রবণতা”। তারা সেই দিন বুঝতে পেড়েছিলেন যে, সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্বে ইউরূপ ও রাশিয়ান সাম্রাজ্যবাদের বিপরীতে গন সংগ্রামের বিকল্প নেই। তবে এটা কিন্তু চে র সেই “ দুই, তিন ও অনেক ভেয়েতনাম” সৃজনের পথ নয়। এই তত্ত্বের মূল কথা ছিলো, বিশ্ব পল্লীর বিপরীতে বিশ্ব নগরকে মোখোমুখি করা । বা এশিয়া, আফ্রিকা ও ল্যাতিন আমেরিকার কে সাম্রাজ্যবাদের বিপরীতে দাড় করিয়ে দেয়া। এই ভাবে লিন পিয়াং রাজনীতিকে একটি ভিন্ন মাত্রা দিয়ে ছিলেন। একটি আন্তর্জাতিক চরিত্র দান করেছিলেন। কিন্তু ১৯৭০ সালে মাওসেতুং নিজেই দেশীয় চরম পন্থার অনুসারী হয়ে আন্তর্জাতিক নীতি মালা থেকে সড়ে আসেন। তিনি সামগ্রীক ভাবে স্বদেশ মূখি নীতি গ্রহন করেন আর আন্তর্জাতিক নীতি বাদ দেন। ডান পন্থার রাজনীতি হয়ে উঠে তাঁর একটি বড় উপাদান। ১৯৭১ সালে নিল পিয়াং কে হত্যা করা হয়। মাওসেতুং কার্যত ডান পন্থী ও সংশোধনবাদীদের কবলে নিপতিত হয়ে পড়েন। তিনি সর্বহারা স্বার্থের পরিবর্তে জাতিয় স্বার্থের প্রতি বেশী গুরুত্ব আরোপ করেন। তাঁর নীতি হয়ে উঠে “ সকলের সাথে শান্তিপূর্ন” এমন কি সাম্রাজ্যবাদের সাথে ও শান্তি পূর্ন ভাবে বসবাস করা । তারা বললেন যে, সাম্রাজ্যবাদের সাথে সহন শীল নিটি গ্রহন করুন। “শান্তি পূর্ন সহাবস্থান” এক সময় সৌভিয়েতের এই নীতির তিব্র সমালোচক ছিলেন মাওসেতুং। আর এখন তিনি ও তাঁর চীন সেই নীতিই গ্রহন করলেন। তাঁর সেই লাইনকে বলা হয়েছিলো “মাওয়ের তৃতীয় বিশ্ব তত্ত্ব”, তা কিন্তু কোন ভাবে “তৃতীয় বিশ্ববাদ” নয়।
৮. বলা হয় লিন পিয়াং প্রতিক্রিয়াশীল রাজনীতির চর্চা করতেন, বিষয়টি ব্যাখ্যা করবেন ?
লিন পিয়াংয়ের বিরুদ্বে এটা একটা মিথ্যা অভিযোগ যা রাজনৈতিক অপরাধ। চীনের রাজনীতিতে লিন পিয়াং কে কেন্দ্র করে বহু রকমের রাজনৈতিক আবর্তন বিবর্তন ঘটে গেছে। লিন পিয়াং কে অতি বাম পন্থী মানুষ হিসাবে ও চিত্রিত করা হয়েছে। তাকে সাংস্কৃতিক বিপ্লবের অগ্রনী হিসাবে বর্ননা করা হয়েছে। এমন কি তাঁর মৃত্যুর পর তাকে অতিবাম ও নৈরাজ্যবাদি হিসাবে ও বলা হয়েছে। তিনি সাধারন মানুষের জীবন মান উন্নয়নের স্বার্থে নিজেদের জীবন যাত্রাকে পরিবর্তন করতে চেয়েছিলেন। চীনের উন্নয়ন ও আদর্শিক বিশুদ্বতার জন্য তিনি উদ্যোগী ছিলেন। তাকে অভিযুক্ত করা হয় এই বলে যে, তিনি নাকি জাতীয় উন্নয়নের স্বার্থ বিরোধীতা করে আন্তর্জাতিক সর্বহারার স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়েছিলেন। অনেকে লিন পিয়াংয়ের সমালোচনা করতে গিয়ে সামগ্রীক ভাবে মাওবাদের ও সমালোচনা করে বসেছেন। তাঁর সমালোচনা করতে গিয়ে বলেছেন তিনি “ অতিবাম মানে হলো তিনি ডান” তাকে ডান পন্থী হিসাবে অভিহিত করে ১৯৭০ সালে নানা ভাবে আক্রমন করা হয়েছে। ১৯৭০ সালে ডান পন্থী ও বাম পন্থার সকলেই সম ভাবে লিন পিয়ং কে আক্রমন করতে থাকেন। ১৯৭১ সালে ও তাঁর বিরুদ্বে অতি চরম পন্থার লোক হিসাবে চিত্রিত করা হয়েছে। আবার ১৯৭৩ সালে তাকেই অতি ডান পন্থী বলা হলো। আবার হাস্যকর ভাবে ১৯৮০ সালে তাকে আবার একজন অতি বাম পন্থী মানুষ হিসাবে দেখানো হলো। আজ তো এটা পরিস্কার যে লিন পিয়াং আর কেঊ নন তিনি এক জন সাম্যবাদি ও মাও ক্যাম্পের লোক। তবে গোঁড়ামি পন্থার অনুসারীদের প্রচারনার এখনো শেষ নেই।
হাস্যকর ভাবে গোঁড়ামি বাদি মাওবাদি চক্র আবার বলতে শুরু করেছেন যে, লিন পিয়াং না কি কনফুসিয়ান ছিলেন। গোঁড়ামি পন্থীরা এও বলেন যে তিনি নাকি গোপনে কনফুচিয়ান ভাব ধারার অনুসারী ছিলেন। এর প্রমান হিসাবে তারা হাজির করেন যে, তাঁর মৃত্যুর পর তাঁর বাসায় কনফুচিয়ান বই পুস্তক পাওয়া গেছে। তারা মনে করেন যে, যেহেতু তিনি সেই সাহিত্য পড়েছেন তাই তিনি কনফুসিয়ান ভাব ধারায় রাজনীতিকে টেনে নিতে চাইছেন। এই রূপ হাস্যকর বয়ান আর কোথায় পাওয়া যাবে তা আমাদের জানা নেই। আমার ব্যাক্তিগত গ্রন্থাগারে বাইবেল, কোরন, ও ট্রটস্কির বই পুস্তক আছে। এর অর্থ কি তা হলে এই হয় যে, আমি একজন খৃস্টান, মুসলিম ও গোপনে ট্রটস্কিবাদি । মাওসেতুং নিজেই বলে গেছেন তরুণদের উচিৎ তাদের মনকে উন্মুক্ত রাখা। যা পছন্দ করা না ও পড়ে দেখ । তিনি নিজে দ্রুপদি সাহিত্য পড়েছেন। আর এটাই স্বাভাবিক বিষয়। অথচ, গোঁড়ামি পন্থী ও প্রতিক্রিয়াশীল মাওবাদিরা লিন পিয়াং কে কনফুসিয়ান বানিয়ে দিলো। তারা আসলে বিজ্ঞান বুঝেন না । বিজ্ঞানের চেতনা ও তারা ধারন করেন না ।
গোঁড়ামি পন্থী মাওবাদীরা বলে থাকেন যে লিন পিয়াং নাকি সাংস্কৃতিক বিপ্লবের বিরোধী ছিলেন। কিন্তু বাস্তবতা হলো তাঁর জানীতি ছিলো সত্যিকার ভাবে সামাজিক পরিবর্তনের পক্ষে । লিন পিয়াং যে তত্ত্বে বিশ্বাস করতেন তা হলো “রাজনীতিকে কম্যান্ডে রূপান্তর” করা তত্ত্ব। তিনি সামরিক বাহিনীকে মাওবাদের সত্যিকার ধারায় ফিরিয়ে আনার জন্য কাজ করছিলেন। তিনি সর্বত্র জনমত গড়ে তুলার কাজ করছিলেন যেন চীনে যৌথ অর্থ ব্যবস্থা গড়ে উঠে। তিনি চীনে একটি সু সংহত একটি অর্থনীতি গড়ে তুলে “জনগণের সেবার” আদর্শ কায়েমের চেষ্টা করছিলেন। তিনি সমগ্র চীনকে মাওবাদের একটি মহা বিদ্যালয় হিসাবে গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন। তিনি উচু নিচু পদ মর্যাদাকে বিদূরীত করতে চেয়েছিলেন। তিনি সত্যিকার সাম্যবাদ সমাজের সকল স্তরে কায়েম করার জন্য চেষ্টা করছিলেন। লিন পিয়াং তাঁর বাহিনীকে “ সাম্যবাদ কায়েম না পর্যন্ত জনযুদ্ব করার জন্য” প্রস্তুত করছিলেন। তিনি তাঁর বিশ্ব ব্যাপী বিপ্লবের বানী প্রচারে মনযোগী ছিলেন।
কেহ কেহ বলেন লিন পিয়াং ব্যাক্তি পুজার পক্ষে ছিলেন। এটা সত্য । তবে তা মাওবাদি দল ও মাওবাদ বিরোধী দলের সকলেই এই চর্চা করতেন। পরবর্তীতে চার খলিফা ও লিন এই বিষয়ে দোষারূপ করেন, তারা লাল বই প্রচার, একেই রকমের পোষাক পড়া সহ নানা বিষয়ে তাঁর সমালোচনা করেন । লিন পিয়াংয়ের সাথে চেন বোধা ও একেই ভাবে কাজ করেছিলেন। বাস্তবতা হলো প্রায় সকলেই সেই সময়ে ব্যাক্তিবাদের প্রতি আকৃষ্ট ছিলেন। এমন কি আমলারা ও এর বাহিরে ছিলেন না । তারা লিন ও মাওয়ের নাম করে জনগণের সাথে কথা বলতেন। মাওসেতুংয়ের উত্তরাধিকার হিসাবে লিন পিয়াংয়ের সাথে জেন কুইন, যিয়ান চ্যাঙ্কুইস কে সংবিধানে যুক্ত করে দেন।
লিন পিয়াংয়ের বিরুদ্বে বলা হয় যে তিনি না কি স্বজন প্রীতি করেছিলেন। চার খলিফার সমর্থকদের মাঝে ও এমন কিছু লোক আছেন যারা বলেন লিন পিয়াং নাকি তাঁর ছেলের প্রমোশন দিয়েছেন অবৈধ ভাবে। মাওবাদিরা বলেন তাঁর স্ত্রী জেন কুইন ও নাকি স্বজন প্রীতি করেছিলেন। জেন কুইন নাকি পরিকল্পনা করেছিলেন মাওয়ের মৃত্যুর পর রাজ করার জন্য। অভিযোগ হলো পারিবারিক সম্পর্কের সূত্রের পথ ধরে রাজতান্ত্রিক ধারা সৃজনের কথা? দেংগিস্ট সুযোগে সংশোধনবাদি ধারা প্রবর্তন করে ফেলে। মাওবাদিরা যদি অভিযোগ করেন যে লিন পিয়াং স্বার্থ পর ব্যাক্তি ছিলেন তবে জেন কুইনের সাথে মাওয়ের সম্পর্ককে তাঁরা কি বলবেন। বাস্তবতা হলো চীনের রাজনীতি পারিবারিক ও অফিসিয়াল পরিস্থিতি একাকার হয়ে গিয়েছিলো। কেবল লিন পিয়াংয়ের ছেলের চাকুরী আর পদনোন্নতি আলাদা কোন বিষয় নয়। জনগণের মাঝে ও বিষয়টি স্বাভাবিক ভাবে বিবেচিত হত।
অনেকে লিনের প্রতি এই অভিযোগ ও আনেন যে তিনি গোড়ামীবাদ ও নিন্দাবাদের সমালোচনা করতেন। তা অবশ্য যথার্থ। তিনি তখন সত্যিই বাম পন্থী ও গোঁড়ামি পন্থীদের সমালোচনা করছিলেন। তাঁরা চার খলিফাকে সকল কিছু উর্ধে তুলতে চাইতেন। তাঁরা অন্যান্য সকলের চাইতে তাদের কথাকে বেশী মূল্য দিতেন। তবে সমালোচনা কারীদের মাঝে ও অনেক বিপ্লবী মনোভাবাপন্ন মানুষ ছিলেন।
গোড়ামীবাদি চক্র বহুবার লিন পিয়াংয়ের বিরুদ্বে অভিযগ অনেন যে তিনি নাকি উৎপাদন শক্তি তত্ত্বের সমর্থক ছিলেন। এই বিষয় টি যাছাই কারে দেখা গেছে এর আসলএ কোন প্রকার ভিত্তি নেই। ১৯৬৯ সালের নবম কংগ্রেসে লিন পিয়াং ও চেন বোধা অর্থনৈতিক উন্নয়নের উপর গুরুত্ব আরোপ করেছেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে। তাদের এই অভিযোগ একেবারেই ভিত্তিহীন। তাদের রাজনৈতিক লাইন ও নথি এই কথা বলে না । আর এই অভিযোগটি আনা হয় লিন পিয়াংয়ের মৃত্যুর পর। এটা অনেকেই জানেন যে চীনের রাজনৈতিক ইতিহাস নানা সময় নানা ভাবে সাজানো হয়েছে। রাজৈতিক বাতাসের উপর ভিত্তি করে। যে দিকে বাতাস সেই দিকে পালের নীতি গ্রহন করা হয়েছে। লিন ও চ্যান বোধার বিরুদ্বে সংশোধনবাদের অভিযোগ ও প্রতিবিপ্লবের জন্য দায়ী করা হয় । অথচ আমরা জানি এঁরা সর্বদাই মাওবাদের প্রতি ছিলেন আস্থাশীল ও অনুগত।
গোড়ামীবাদি মাওবাদিরা অভিযোগ করেন যে লিন পিয়াং সৌভিয়েত সংশোধন পন্থীদের সমর্থক ছিলেন। হ্যা, কথা টা গুরুত্বপূর্ন হলে ও এর কোন প্রকার ভিত্তি খোঁজে পাওয়া যায়নি। যে বিমানে করে লিন ও তাঁর পরিবারকে বহন করে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিলো তা ছিলো মঙ্গোলীয় ও চীনের সিমান্ত এলাকায় তা কোন ভাবেই সৌভিয়েত এর প্রতি ছিলো না । সেই বিমানটিকে অত্যান্ত রহস্যজনক পন্থায় ধ্বংস করা হয়েছে। বিশেষজ্ঞগন বলেছেন তাকে গুলি করে ধ্বংস করা হয়েছে। এটা তো পরিস্কার যে তাকে পরিকল্পিত ভাবে স্বপরিবারে হত্যা করা হয়েছে। লিন পিয়াংয়ের বিখ্যাত কথা ছিলো, বিপ্লব দির্ঘজীবি হোক, জন সংগ্রামের বিজয় আসুক! প্ররতিবীর সামনে বিপ্লবের মডেল তুলে ধরুন। দুনিয়ার সকল পল্লী জেগে উঠবে দুনিয়ার সকল শহররের বিরুদ্বে। এশিয়া, আফ্রিকা, ল্যাতিন আমেরিকা তথা তৃতীয় বিশ্বের মানুষ বিপ্লব করবে প্রথম বিশ্বের বিরুদ্বে। পতন ঘটাবে সকল সৌভিয়েত সামাজিক সাম্রাজ্য সহ সকল প্রকার সাম্রাজ্যবাদের। কায়েম করবে আলোকিত সাম্যবাদের।
এটা একটা হাস্যকর বিষয় যে গোড়ামীবাদি মাওবাদিরা লিন পিয়াঙ্গকে একজন সম্রাজ্যবাদের দুষোর হিসাবে দেখানোর প্রয়াস পেছেন। বিশেষ করে ১৯৭০ সালে মাও যখন সৌভিয়েত বিরুধীতা করতে গিয়ে সাম্রাজ্যবাদের বন্দ্বু হয়ে উঠেছিলেন। সংক্ষেপে বললে ও বলতে হয় ১৯৭০ সালের পর মাওয়ের ভূমিকা ছিলো সত্যি জগন্য। মাও বেশ কিছু ফ্যাসিবাদিদের সাথে হাত মিলিয়েছিলেন। তিনি পাকিস্তানীদের সাথে মিলে বাঙ্গালী নিধনে অংশ নিয়েছিলেন। তিনি পাকিস্তানীদের সাথে হাত মিলিয়ে গনহত্যায় শরীক ছিলেন। মাও পিনু চ্যাটের সমর্থক ছিলেন। মাও ইরানের শাহ এর সমর্থক সেজে সি আইয়ের পুতুলকে প্রশংসা করেছেন। নিতি নিক্সনের সাথে গভীর বন্দ্বুত্ব গড়ে তুলে ছিলেন। তিনি ১৯৬০ সালের সৌভিয়েত ইউনিউনের মতই সাম্রাজ্যবাদের সাথে “ শান্তিপূর্ন সহবাসে” বিশ্বাসী হয়ে উঠেন। তিনি ১৯৭০ সালে সর্বহারা পরিবর্তে পশ্চিমাদের প্রতি বেশী আগ্রহী হয়ে উঠেন। লিন পিয়াং ছিলেন এই ধারার বিপরীত।
৯. গোঁড়ামি পন্থী মাওবাদি চক্র কেমন করে পশ্চিমাদের প্রতি ঝুঁকে পড়লেন ?
কোন কোন সময় ১৯৭০ সালে মাওয়ের উত্থাপিত “তত্ত্ব তৃতীয় বিশ্ববাদের” বিষয় টি নিয়ে মাওবাদিরা যেখানে সেখানে হৈ চৈ করে। রাজনীতির মাঠে নিজেদের অস্থিত্ব জানান দেয়। প্রকৃত সত্য হলো মাওসেতুং এর তিন বিশ্ববাদ তত্ত্ব ও আমাদের উত্থাপিত “তৃতীয় বিশ্ব” এক জিনিস নয়। একেই ভাবে এই গুলো এঁকে অন্যের সম্পূর্ন বিপরীত তত্ত্ব। আমরা যদি ১৯৬৯ সালের চীনের কমিউনিস্ট পার্টির নবম কংগ্রেসের বক্তব্য বিশ্লেষণ করি তবে দেখব যে, তখন মাও পশ্চিমা বিশ্বের দিকে ক্রমে ঝুঁকছেন। লিন পিয়াংয়ের জন সংগ্রামের পথ পরিহার করছেন। গোঁড়ামি পন্থী মাওবাদিরা এটা ও দাবী করেন যে, সৌভিয়েত সাম্রাজ্যবাদ সেই সময়ে অধিকতর আগ্রাসী হয়ে উঠছিলো। তাঁরা এটাকে হিটলারের সাথে তুলনা করছিলেন। তাঁরা মনে করতেন যে স্ট্যালিন সাম্রাজ্যবাদের চেয়ে ও বেশী ভয়ংকর। তাই তাঁরা আরো অগ্রসর হয়ে বলতেন যে। তাদের মতে নেটো জোট এর চেয়ে ভালো ।
গোঁড়ামি পন্থীরা বলেন যে, ১৯৭০ সালের সৌভিয়েট ইউনিয়ন একটি সাম্রাজ্যবাদী শক্তি। ১৯৬৯ সালে চীনের সাথে সৌভিয়েট ইউনিয়নের জেনবাও দ্বীপ নীয়ে মতবিরোধ দেখা দেয়। কিছু মানুষ ও তখন মারা গিয়েছিলেন। ১৯৬২ সালে চীন – ভারত যুদ্ব হয়। সেই মাওবাদিরা এই সকল কারনে পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদিদের সাথে সম্প্রীতি স্থাপনের জন্য যুক্তি খোঁজে নেন। অথচ সেই যুক্তি গুলো একেবারেই অর্থহীন। আসুন আমরা সিমান্ত এলাকা নিয়ে কথা বলি। ১৯৫০ ও১৯৫৩ সালে সাম্রাজ্যবাদী চক্র কোরীয়ার উপর গন হত্যা চাপিয়ে দেয়। চিনের মানুষ স লক্ষ লক্ষ মানুষ খুন হয় সেই লড়াইয়ে। পশ্চিমারা তিব্বতের যুদ্বে সমর্থন দিয়েছিলো। পশ্চিমারা ভিয়েতনামে এক মারাত্মক যুদ্বের সূচনা করেছিলো। এঁরা সেখানে দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্বের চাইতেও বেশী বোমা সেখানে নিক্ষেপ করে। তাঁরা লাউস ও কম্ভোডিয়ায় লড়াই করে। এঁরা ইন্দোনেশিয়ায় মানুষের রক্তের গঙ্গা বসিয়ে দেয়। আমারা জিজ্ঞাসা চীন কি সৌভিয়েত ইউনিয়নের কাছ থেকে সেই রূপ কোন যুদ্বের সম্ভাবনা দেখাছিলো। আমারা মনে হয় যারা গোঁড়ামি পন্থী উরা ইতিহাসের সঠিক বিশ্লেষণে উতসাহিত নন। তাঁরা বিজ্ঞান ভিত্তিক অনুসন্দ্বানে আগ্রহী নন। তাঁরা মতান্দ্বতায় আক্রন্ত হয়ে আছেন। তাঁরা মতান্দ্বতা বা গোড়ামীপনাকেই বেশী পছন্দ করেন।
১০. আপনি কেন কিসের ভিত্তিতে দাবী করেন যে লিন পিয়াং অভ্যুত্থানের জন্য দায়ী নন ?
দুনিয়া এপর্যন্ত যত গুলো মিথ্যা অভিযোগ আছে এর মধ্যে লিন পিয়াঙ্গের বিরুদ্বে যে অভিযোগ করা তা এটি একটি জগন্যতম অভিযোগ। কেহ যদি সত্যিকার অনাবিল মন মানষিকতা নিয়ে লিন পিয়াংয়ের বিরুদ্বে অভ্যুথানের অভিযোগটি বিশ্লেষণ করেন তবে তাঁর মানসকতা পরিবর্তন হতে বাধ্য। সামগ্রীক ভাবে অভিযোগটি খতিয়ে দেখলে বুঝায় যে তা ছিলো একটি সাজানো নাটক। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে গায়েল করার এক অপ কৌশল মাত্র। কারনঃ-
প্রথমতঃ লিন পিয়াংয়ের বিরুদ্বে যে সকল অভিযোগ আনা হয়েছে তাঁর নথি পত্র বিশ্লেষণ করে ও সাক্ষ্য প্রমানাদি যাচাই করে দেখা গেছে যে এই অভিযোগের সত্যিকার কোন ভিত্তি নেই । তা কেবল রাজনৈতিক উদেশ্য হাসিলের জন্য ও রাজনৈতিক ভাবে হেয় প্রতিপন্ন করার জন্য লিনের বিরুদ্বে অভিযোগের আংগুল তোলা হয়েছে। তা কোন ভাবে বিস্বাস যোগ্য নয়।
দ্বিতীয়তঃ বলা হয় লিন একটি অভ্যুত্থান ঘটানোর জন্য একটি “পরিকল্পনা ৫৭১” তৈরী করেছিলেন। মাওসেতুং নিজে এবং চৌএনলাই এই পরিকল্পনার কথা কোন কালেই বিশ্বাস করেন নাই। যে পরিকল্পনাটির কথা বলা হল তা কোন ভাবেই লিন পিয়াংয়ের জীবন ও রাজনীতির জ্ঞানের প্রবাহের সাথে মিলে না । যিনি এই পরিকল্পনাটি লিখেছেন তা ছিলো সামরিক জ্ঞান সম্পর্কে খুবই অদক্ষ। সেই পরিকল্পনায় প্রচুর সামরিক বিষয়ে ভূল ছিলো। ফলে প্রমানিত হয় যে সেই পরিকল্পনাটি লিন বা তাঁর ছেলে বা অন্য কোন সামরিক বিশেষজ্ঞ তৈরী করেন নাই। সেই পরিকল্পনাটি যে ভোয়া ছিলো তা সহজেই অনুমান করা যায়। এই পরকল্পনায় এমন কিছু ব্যাক্তির নাম যুক্ত করা হয়েছে যারা চীন বিরোধী হিসাবে পরিগনিত হয়ে আসছেন। অথচ ভেবে দেখুন যদি আপনি কোন পরিকল্পনা করেন তবে আপনার বিশ্বস্থ ও দেশ প্রেমিক লোক দেরকেই সাথে নিবেন, ঠিক ?
সম্ভবত এটাই সবচেয়ে প্রথম ক্যু যাতে ক্যু কারীগন নিজেদেরকে সৌভিয়েত সাম্রাজ্যবাদ, সামন্তবাদ ও চীনের কুমিংতাং এর বিরুদ্বে প্রকাশ্যে কথা বলেছেন। যার সমাপ্তি হয় জাপানের প্রশংসা করে। ভেবে দেখুন বিষয়টি কত হাস্যকর। কেনন না তা চীনের নানা দলিল পত্রে থাকলেও গন মাধ্যমে প্রকাস করতে দেয়নি। সেই দলিল গুলোর সম্পর্কে বেইজিং রিভিউতে বলা হয়েছে। কিন্তু তাতে কোন প্রকার উদ্বৃতি ব্যবহার না করে কেবল রেফারেনস উল্লেখ করা আছে। দলিলাদি ভালো ভাবে পরীক্ষা করে দেখা গেছে – লিনের বিরুদ্বে যে সকল অভিযোগ আনা হয়েছে তা একেবারেই ভিত্তিহীন। পার্টি সকল বিষয়কে গোপন করে রেখেছিলো। কিন্তু হাস্যকর বিষয় হলো এখন ও কতিপয় গোঁড়ামি পন্থী মাওবাদি সেই দলিলের কথা বলে লিনের বিরুদ্বে বিশোদ্বগার করেন অথচ আমি এমন একজন মাওবাদি ও পাইনি যারা মূল দললাদি পড়ে দেখেছেন। কিন্তু আমি যখন দললাদি সংগ্রহ করে হাজির করেছি তখন দেখলাম লিনের বিরুদ্বে উত্থাপিত সকল অভিযোগই ছিলো মিথ্যায় পরিপূর্ন।
তৃতীয়তঃ লিনের বিষয়ে বহু হাস্যকর বিষয়ের অবতারনা করা হয়েছিলো। যেমন যখন তাঁর মেয়ে সরকারকে খবর দিলো যে তাঁর বাবা লিন পিয়াং কে কতিপয় অস্ত্রধারী লোক তুলে নিয়ে গেছে। তাঁকে অপহরণ করা হয়েছে। সেই সময় থেকেই তাঁর মেয়েকে গৃহ বন্দী করে রাখা হয়েছিলো। তাঁকে কারো সাথে কথা পর্যন্ত বলতে দেয়নি। চীনা রক্ষীদের আয়ত্মের বাইরে গিয়ে কিছুই করতে দেয়া হয়নি। সত্যিকথা হলো পুরো বিষয়টি ছিলো অসত্যে পরি পূর্ন। আসলেই কি লিনের মেয়ে তাঁর বাবার অপহরণে খবর দিয়েছিলেন? অধিকন্ত যে বিমানটি লিন কে বহন করছিলো তাকি সত্যি প্রস্তুত ছিলো। এটা লিনের সামরিক জ্ঞানের সাথে কেবারেই মানান সই নয়। অন্যদিকে চৌএনলাই পুরু বিষয়টি জানতেন, তিনি বলেছেন বিমানটি সৌভিয়েতের দিকে গিয়েছিলো। ভেতর থেকে গুলি করা হয়েছিলো। কিন্তু তদন্তে এর কোন প্রমানই পাওয়া যায়নি। ফলে বিষয়টি মোটেই বিশ্বস যোগ্য নয়।
চতুর্থতঃ চীনে যে ক্যু এর কাহিনী বানানো হয়েছিলো তা একেবারেই বানোয়াট। তা কোন ভাবে লিন পিয়াংয়ের চরিত্রের সাথে মানান সই নয়। মাওসেতুং ও লিনের নানা কথা বার্তায় আমরা এই বিষয়ে অবগত আছি। গোঁড়ামি পন্থী চক্র একটি ক্ষমতা দখলের, ও দুই জন বড় মাপের নেতার মানসিক দ্বন্দ্বকে আমলে নিয়ে সকল কিছু বিচারে নেমেছেন। তাঁরা এটা জানতেন যে লিনই হলেন এমন এক ব্যাক্তি যিনি মাওয়ের কথার বিপরীতে কথা বলার সাহস রাখেন। তারই রাজনৈতিক ক্ষমতা আছে। ষড়যন্ত্র কারী চক্র সেই সুযোগ টি নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করেছে। সেই সময় কার লিনের একজন চিকিৎসক তাঁর লিখায় বলেছেন লিন নিজে ও তাঁর স্বাস্থ্যগত কারনে ক্ষমতা চাইতেন না । অথচ তাঁকে মাও তাঁর উত্তরাধিকার করে ছিলেন। তিনি সেই দায়িত্ব নিতে চাইছিলেন না । তা হলে মাওয়ের বিরুদ্বে গিয়ে তিনি ক্যু করতে যাবেন এটা বিশ্বস যোগ্য নয়। তিনি মাও ও তাঁর পরিবারকে অত্যন্ত ভালো বাসতেন। তা হলে তার বিরুদ্বে ক্যু করার অভিযোগ কিভেবে বিশাস করা যায় ?
পঞ্চমতঃ চীনে ভূয়া প্রতিবিপ্লবের ইতিহাস নতুন কিছু নয়। তা বার বার হয়েছে। ১৯৭০ সালে গোঁড়ামি পন্থী মাওবাদিরা মনে করতেন যে চার খলিফাই মাওয়ের উত্তরাধিকার হতে যাচ্ছেন। তাদের বিরুদ্বে ও লিনের মতই ক্যু এর অভিযোগ করা হয়েছিলো। তাঁরা তিব্রভাবে সেই অভিযোগ অস্বীকার করেন। চক্রান্তকারীরা সর্বদাই কোন না কোন অজুহাতে তাদের পথের কাটা সরানোর জন্য উঠে পড়ে লেগেছিলেন। সেই অভিযোগ সমূহের কোন প্রকার ভিত্তি ই ছিলো না ।
একটি গুরুত্বপূর্ন বিষয় হলো যে, সমাজতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থায় এই ধরনে বিষয় সর্বদাই লক্ষ্য করা গেছে। স্ট্যালিনের বিরুদ্বে তাঁর আমলে ও মাওয়ের আমলে এবং সাংস্কৃতিক বিপ্লবের সময়ে সন্দ্বেহবাদ পিছু ছাড়েনি। রাজনৈতিক বিষয়কে পুলিশি কায়দায় সমাধানের চেষ্টা দেখা গেছে। আসল বিষয় ছিলো রাজনৈতিক বিতর্ক। বিচারের নামে প্রহসন করার ঐতিহ্য লিন পিয়াংয়ের সময়ে ও মাওবাদি সমাজতন্ত্রী রা অতিক্রম করতে পারেন নাই।
আমি যখন লিন পিয়াংয়ের বিষয়ে অনুসন্দ্বান শুরু করি তখন আমার উদ্দেশ্য ছিলো না তাঁকে বাচানোর, আমার আসল উদ্দেশ্য ছিলো তাঁর অভিযোগের সত্যতা প্রমান করা ও আসল ঘটনা লোকদের সামনে হাজির করা । আমি দেখলাম যে তাঁর মৃত্যুর পর সাংস্কৃতিক বিপ্লবের সময়ের অনেক তথ্য অসংগতি পূর্ন। আর গোঁড়ামি পন্থী মাওবাদিরা বলছিলো যে তিনি নাকি ভূয়া সাম্যবাদি ছিলেন, যিনি চাইতেন সাম্যবাদের পতন হোক। তাই আমার ও মনে নানা প্রশ্ন জাগে। আমি চাইলাম তাদের বক্তব্যের সত্যতা প্রমান করতে। কিন্তু, আমি যখন তা জানতে শুরু করি দেখলাম লিনের বিরুদ্বে যা যা বলা হচ্ছে তা ভিত্তিহীন ও অসত্য। তা দেখে আমি অবাক হই। মাওবাদিরা দাবী করছেন যে তাঁরা মানব সভ্যতার একটি উচ্চতর স্তরে অবস্থান করছেন। আর তা হলো সাংস্কৃতিক বিপ্লব। তাঁরা কেমন করে মিথ্যা দিয়ে সত্যকে ঢেকে দিচ্ছে। তাদের অনেকের সাথে কথা বলে দেখলাম যে তাঁরা লিন ও সাংস্কৃতিক বিপ্লব সম্পর্কে তেম্ন কিছুই জানেন না । তাঁরা কেবল বেইজিং রিভিঊর কিছু শ্লোগান আওড়ায় । তাঁরা প্রকৃত অর্থ ও তাঁরা বুঝেন না । তাঁরা বিপ্লবী পর্যটকের মত বিপ্লবকে দেখেন। সত্যিকার বিজ্ঞান অনুসরন করেন না । যাদের কাছে বিজ্ঞান ভিত্তিক জ্ঞানের চর্চা নেই তাঁরা কেমন করে সত্যকে উপলব্দি করবেন ? কিভাবে বিপ্লবের পথেই বা এগবেন। তাই প্রশ্ন জাগে মাওবাদকে অধিকতর বিপ্লবী পথে নিয়ে যেতে চাইলে আমাদেরকে বিজ্ঞানের পথ ধরতে হবে। তা আজ আমাদের কাছে আছে আর এটা হলো আলোকিত সাম্যবাদ।
১১. সামগ্রীক ভাবে বিবেচনা করলে কি আমরা বলতে পারি যে আপনি লিন পিয়াংবাদী ?
আমি অতীতের আলোকিত সকল কিছুকেই ধারন করি । সেই অর্থে আমি একজন মার্ক্সবাদি, লেনিনবাদি, মাওবাদি ও লিন পিয়াংবাদি। তবে আমি সেই ভাবে কিছুই নই। আমি বিপ্লবী সংগ্রাম ও আন্দোলনের সকল কিছুকে ধারন করি। আমি সকল ঐতিহ্যকে মেনে চলি। আমি আলোকিত সাম্যবাদি, আমি বিপ্লবী বিজ্ঞানী। আমি সত্যের জন্য কাজ করি। যারা সত্যের আনুসারী তারাই আমার নেতা ।
লিন পিয়াঙ্গকে আমার কাজের কেন্দ্রে আনার কিছু গুরুত্বপূর্ন কারন আছে। প্রথম কারন হলো লিন পিয়াং একজন বিপ্লবী। তিনি মাওবাদের একটি গুরুত্বপূর্ন সময়কে ধারন করেন। তিনি সাংস্কৃতিক বিপ্লবকে সারা দুনিয়ায় ছড়িয়ে দিতে চেয়েছিলেন।
দ্বিতীয়তঃ আমি লিন পিয়াঙ্গকে একজন সত্যের মাপকাঠি মনে করি। তিনি গানিতিক ভাবে ও বিজ্ঞান সম্মত পন্থায় বিপ্লবের ধারাকে ব্যাখ্যা করেছেন। যদি আপনি সত্যের জন্য প্রশ্ন করতে সাহস না পান তবে আপনি সর্বহারার জন্য কোন কাজেই না । আপনি আসলে গোড়ামীপনার শিষ্য, ন্যায় বিচারের পক্ষের লোক আপনি নন। আপনি বিপ্লবী হতে পারেন না । আপনি লিডিং লাইট নন। বিপ্লবী আন্দোলন আপনি থামিয়ে দিতে পারেন। আপনি অন্ধকার দূর করতে পারবেন না । আপনি বিজ্ঞান মনস্ক নন। আপনি অন্ধ্বকারের বন্দ্বু। বিপ্লব আপনার কাজ নয়।
১২. আপনি কেন মনে করেন যে মাও ১৯৭০ সাল থেকে ভুল পথে চলে গিয়েছিলেন ?
মাওসেতুং একজ মানুষ ছিলেন। তাঁর ও ভূল হতে পারে। মানুষের ভূল থাকেই। সেই সময়ে মাওয়ের বয়স হয়ে গিয়েছিলো। মাওয়ের চিকিৎসক বলেছেন লিন পিয়াংয়ের বিচ্ছেদের পর মাওয়ের শরীর দিনে দিনে ভেঙ্গে পড়ছিলো। তিনি যখন নিক্সনের সাথে সাক্ষাত করছিলেন তখন তাঁর সাথে অক্সজেনের বোতল ছিলো। তা গোপন করার ও চেষ্টা করা হয়েছিলো। দশম কংগ্রেসে সকল সদস্যরা আসার আগেই মাও হল ত্যাগ করে চলে গিয়েছিলেন। তিনি তখন ও একা একা হাটতে পারতেন না । তাঁর শারিরীক অবস্থা খুবই খারাপ ছিলো। মাওয়ের মাঝে চীনে পুনঃ দূর্ভিক্ষের আশংখা কাজ করছিলো। তিনি সাংস্কৃতিক বিপ্লবের গতি পথ পাল্টে দিতে চাইছিলেন। মাও নিজেই মাওবাদিদেরকে নিয়ে বিভ্রত ছিলেন। বিপ্লবের প্রতি অনেক ক্ষেত্রে তাঁর তেমন নির্ভরতায় ঘাটতি ছিলো। মাও ও চার খলিফার মাঝে বিপ্লবের প্রতি কিছু কিছু ক্ষেত্রে অনিহা দেখা গেছে। তখন তাদের মাঝে বিপ্লবের চেয়ে সংশোধন পন্থার চর্চা দেখা দেয়। তাঁর নজরে যা ভালো মনে হয়েছে তিনি তাই করতে চেয়েছেন।
১৩. আপনি কি মনে করেন সাংস্কৃতিক বিপ্লব পুজিবাদকে নির্মূলে ব্যার্থ হয়েছে ?
সেই ক্ষেত্রে অনেক কারন আছে। ১৯৬০ সালে সাংস্কৃতিক বিপ্লব অনেক গতিশীল আন্দোলন ছিলো, ১৯৭০ সালে লিন পিয়াং সেই বিপ্লবী কার্যক্রমকে গ্রামের মানুষের মাঝে বিস্তার করতে চেয়েছিলেন। মাও তা করতে চান নি। তা ছিলো একটি চরম ভূল সিদ্বান্ত। আমরা মনে করি সেটা ছিলো মাওয়ের একটি বড় ভূল । আমরা দেখি লিন পিয়াংয়ের মৃত্যু ও সামরিক বাহিনীতে মাওবাদের প্রভাব কমিয়ে আনা ছিলে মাওয়ের ভূল। অনেক জায়গায় আন্দোলনকে থামিয়ে দেয়া হয়েছিলো। শ্রমিক শ্রেনীর প্রাধান্য খর্ব করা হয়। ১৯৭৬ সালে চার খলিফাকে গ্রেফতার ও সমালোচনা মূলক লিখা বন্দ্ব করে দেয়া কোন ভাবেই কাম্য ছিলো না । ফলে সমাজতন্ত্রের সংকট ঘনীভূত হয়।
আরো কিছু কারন ছিলো যে, প্রথমিক ভাবেই সমাজতন্ত্র কায়েমের নক্সায় গোড়ামীপনার প্রভাব ছিলো। যদি ও চীনের নক্সাটি স্ত্যালিনের নক্সার চেয়ে কিছুটা উন্নত ছিল। এটা ছিলো সৃজনশীল, প্রয়োগ যোগ্য ও প্রতিবিপ্লব প্রতিরোধী । কিন্তু সাম্রাজ্যবাদ প্রতিরোধের ক্ষমতা দির্ঘ স্থায়ী করার তেমন কন ব্যবস্থা তাতে ছিলো না।
চীনের সমাজে আজ যে ভাব ধারাটি চালু আছে তা হলো ভালো খাব, ভালো পড়ব, উন্নত জীবন যাপন করব যাকে বলা হয় অর্থনীতিবাদ বা উৎপাদন শক্তিবাদ । সমাজতন্ত্রকে তাঁরা পুঁজিবাদের মতই সাজিয়েছেন। সকল পরিকল্পনা প্রনয়নে তাঁরা পুঁজিবাদের নির্দেশনাকেই অনুসরন করে থাকে। তাদের এখন কথা হলো আমরা প্রথম বিশ্বের মতই জীবন গড়ে তুলব। আমাদের উচিৎ তাদের মাঝে সাম্যবাদের বানী প্রচার করা। আমাদের উচিৎ আধুনিক পুঁজিবাদের ধারনার সাথে সাম্রাজ্যবাদের বিস্তার রুধে কাজ করা। আমাদের আলাদা লক্ষ্য আছে। আমাদের লক্ষ্য হলো আলকিত সাম্যবাদ। আমারা সকল নিপিড়নের অবসান চাই। আমারা আসলে সম্পুর্ন আলাদা ভাবে দুনিয়াকে নিয়া ভাবি। আমরা এক নতুন ধরনের বিপ্লবের কথা বলছি। আমাদের কাজ হলো সাধারন মানুষের জন্য স্বাস্থ্য, খাদ্য, গৃহ, ইত্যাদির ব্যবস্থা করা। আমরা আরো চাই মানুষের জন্য আধ্মাতিক, আদর্শিক, শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতি, লড়াইয়ের মনোভাব, ত্যাগের মনোভাব, প্রাকৃতিক পরিবেশের সংরক্ষন, নির্যাতনের অপসারণ, সামাজিক পরীক্ষা নিরিক্ষা ও আনন্দের ব্যবস্থা করা । আমাদের পথ কোন ভাবেই পুঁজিবাদের মত নয়। মাওবাদিরা প্রথমিক ভাবে সৌভিয়েত পথ অনুসরণ করলেও পড়ে তা তাঁরা আরো উন্নত করে লিডিং লাইটের বিকাশ সাধন করে। বিপ্লবী শক্তির বিকাশ, লিডিং লাইটের বিকাশ, ও আমাদের কম্যান্ডের দ্বারা পরিচালিত হওয়ার নিয়মের সম্প্রসারন করা হয়েছে। আমরা দুনিয়াকে আমাদের দায়িত্বে চালাতে চাই। আমাদেরকে অতীত বুঝতে হবে। আমাদের বিশাল বিজয়ের ইতিহাস থাকলেও আগামীতে আরো বড় বিজয়ের জন্য লড়াই করতে হবে। বিজ্ঞানের বিকাশ ঘটাতে হবে। বিজ্ঞানকে এগিয়ে নিতে হবে। বিজ্ঞান, বিজ্ঞান, বিজ্ঞান হলো আলোকিত সাম্যবাদ। এতাই আমাদের সকলের ভবিষ্যৎ। আমাদের সকলের আসল গন্তব্য।
১৪. আমাদের আজকের সাক্ষাৎকার শেষ করার আগে আপনি কি চুড়ান্ত কিছু বলে চান ?
সাম্রাজ্যবাদের তান্ডব আজ অনেকেই বিপ্লবের পথ থেকে সরে পড়েছেন। তাঁরা এখন ভাবতেও পারেন না যে এর বাহিরে গিয়ে বা ভিন্ন ভাবেও জীবন যাপন করা যায়। তাঁরা এমন কি স্বপ্ন পর্যন্ত দেখতে ভূলে গেছেন। আশা করছি আমরা বিগত দিনের আলোকিত সময়ে আলো সামনে ও ফেলতে পারব। আশা করি আমাদের জ্বালানো আলো অনেকের চোখ খোলে দিবে। আমরা সাম্রাজ্যবাদের পতন ডেকে আনব। তবে আমাদেরকে একত্রিত হতে হবে। আমাদেরকে একতাবদ্ব হয়ে পুঁজিবাদের বিরুদ্বে, সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্বে এবং জনগনের সেবা করার জন্য কাজ করতে হবে। তাদের কত বড় সাহস ওরা আমাদের ভবিষ্যৎ চুরি করে নেয়, তাঁরা আমাদের শিশু সন্তানদের স্বপ্ন কেড়ে নেয় ? আমাদের ভবিষ্যৎ আমাদেরই। আমাদের নিজের গন্তব্য আমরাই ঠিক করে নেব।
ধন্যবাদ ! জেসন। তুমি আমাকে বিশাল জনগনের সামনে হাজির হবার সুযোগ করে দিয়েছ। তুমি আমাকে ধনিদের সম্পর্কে, প্রথম বিশ্ব সম্পর্কে ও সাম্রাজ্যবাদ সম্পর্কে কথা বলার মওকা করে দিয়েছ।
যাদের চোখ আছে, তাঁরা দেখুন। যাদের কান আছে, তাঁরা শুনোন। যাদের মন আছে, তাঁরা ভাবুন। ঝর আসছে। বিপ্লবের সূর বাতাসে বাজতে শুরু করেছে। আমাদের এখন উচিৎ এঁকে অন্যের দিকে বাড়িয়ে দেয়া। আমরা এমন একটি আন্দোলন করছি যেখানে সকল জাতি, ধর্ম, বর্ন ও ভাষার মানুষ মিলিত হবেন। লিডিং লাইট সকলের দিকে হাত বাড়িয়ে আহবান করছে, একটি সত্যিকার সুন্দর বিপ্লব সাধনের জন্য, এক টি নতুন দুনিয়া গড়ে তুলার জন্য। যেখানে বিরাজ করবে অনাবিল শান্তি। থাকবেনা শোষণ নিপিড়ন ও যুদ্বের নির্মমতা। তা হবে আলোকিত সাম্যবাদি পৃথিবী। ধন্যবাদ ! অনুবাদ ও সম্পাদনায়ঃ এ কে এম শিহাব

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s